Monday, June 13, 2011

দোয়া

দোয়া-ই-কুমাইল কুমাইল ইবনে জিয়াদ নাখাঈ ছিলেন আমিরুল মোমিনীন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (আঃ) এর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর। এই অসাধারণ দোয়াটি প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল হযরত আলী (আঃ) এর সমধুর অথচ যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে। আল্লামা মজলিসী (রহঃ) এর বর্ণনা অনুসারে বসরার মসজিদের যে মজলিসে হযরত আলী (আঃ) তাঁর ভাষণে ১৫ই শাবান রাতের তাৎপর্য সম্পর্কে বলছিলেন, সে মজলিসে উপস্থিত ছিলেন কুমাইল। হযরত আলী (আঃ) বলেছিলেন, " যে ব্যক্তি এই রাত জেগে এবাদত করবে এবং নবী খিজিরের দোয়া পড়বে নিঃসন্দেহে ঐ ব্যক্তির দোয়া কবুল হবে। "
মজলিস শেষে কুমাইল হযরত আলীর ঘরে এসে তাঁকে হযরত খিজিরের দোয়া শিখিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। হযরত আলী (আঃ) কুমাইলকে বসিয়ে দোয়াটি আবৃত্তি করেন এবং সেটা লিখে মুখস্থ করে রাখার নির্দেশ দেন।
তারপর হযরত আলী কুমাইলকে পরামর্শ দিলেন, প্রতি শুক্রবারের শুরুতে (অর্থাৎ আগের রাতে ) একবার করে কিংবা অন্ততঃ বছরে একবার এই দোয়াটি পড়তে যাতে করে "আল্লাহ তা'লা শত্রুর অনিষ্ট হতে এবং মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র হতে রক্ষা করেন।" তিনি আরও বলেন, হে কুমাইল! তোমার সাহচর্য এবং উপলব্ধির সম্মানে আমি এই দোয়াটি তোমার হেফাজতে উৎসর্গ করলাম।"

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহুমা সাল্লি আ'লা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মদ।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِرَحْمَتِكَ الَّتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْ‏ءٍ
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আকুতি জানাই তোমার ‘রহমত'-এর উসিলায় যা সমস্ত কিছুকে পরিবৃত করে রেখেছে।
وَ بِقُوَّتِكَ الَّتِي قَهَرْتَ بِهَا كُلَّ شَيْ‏ءٍ
আর তোমার পরাক্রমের উসিলায় যা দিয়ে তুমি সমস্ত কিছুকে পদানত করো।
وَ خَضَعَ لَهَا كُلُّ شَيْ‏ءٍ وَ ذَلَّ لَهَا كُلُّ شَيْ‏ءٍ
এবং যার কাছে সমস্ত বস্তুনিচয় আনত হয় ও আনুগত্য প্রদর্শন করে।
وَ بِجَبَرُوتِكَ الَّتِي غَلَبْتَ بِهَا كُلَّ شَيْ‏ءٍ
এবং তোমার প্রতাপের উসিলায় যা দিয়ে তুমি সমস্ত কিছুকে বিজিত করেছো।
وَ بِعِزَّتِكَ الَّتِي لا يَقُومُ لَهَا شَيْ‏ءٌ
এবং তোমার মহামর্যাদার উসিলায় যার সম্মুখে কোন কিছুই দাঁড়াতে পারে না।
وَ بِعَظَمَتِكَ الَّتِي مَلَأَتْ كُلَّ شَيْ‏ءٍ
এবং তোমার অপার মহিমার উসিলায় যা সমস্ত কিছুর উপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে।
وَ بِسُلْطَانِكَ الَّذِي عَلا كُلَّ شَيْ‏ءٍ
এবং তোমার শাসনের উসিলায় যা সমস্ত কিছুর উপর কর্তৃত্বশীল।
وَ بِوَجْهِكَ الْبَاقِي بَعْدَ فَنَاءِ كُلِّ شَيْ‏ءٍ
এবং তোমার আপন সত্তার উসিলায় যা সমস্ত কিছু ধ্বংস হয়ে যাবার পরও স্থায়ী থাকবে।
وَ بِأَسْمَائِكَ الَّتِي مَلَأَتْ [غَلَبَتْ‏] أَرْكَانَ كُلِّ شَيْ‏ءٍ
এবং তোমার নামসমূহের উসিলায় যা সমস্ত কিছুর উপর তোমার ক্ষমতা প্রকাশ করে।
وَ بِعِلْمِكَ الَّذِي أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْ‏ءٍ
এবং তোমার মহাজ্ঞানের উসিলায় যা সৃষ্টিজগতকে পরিবৃত করে রেখেছে।
وَ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَضَاءَ لَهُ كُلُّ شَيْ‏ء
এবং তোমার পবিত্র সত্তার নূরের উসিলায় যা সমস্ত কিছুকে আলোকিত করেছে।
يَا نُورُ يَا قُدُّوسُ يَا أَوَّلَ الْأَوَّلِينَ وَ يَا آخِرَ الْآخِرِينَ
হে নুর! হে পবিত্রময়! হে তুমি যে অনাদিকাল হতে বিরাজমান। হে তুমি যিনি সবকিছুর পরিসমাপ্তি।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيَ الذُّنُوبَ الَّتِي تَهْتِكُ الْعِصَم
হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা (গোনাহ থেকে) সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে দেয়।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيَ الذُّنُوبَ الَّتِي تُنْزِلُ النِّقَمَ
হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা দুর্যোগ ডেকে আনে।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيَ الذُّنُوبَ الَّتِي تُغَيِّرُ النِّعَمَ
হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা তোমার নেয়ামতসমূহকে (গজবে) পরিবর্তন করে দেয়।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيَ الذُّنُوبَ الَّتِي تَحْبِسُ الدُّعَاءَ
হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা দোয়া কবুল হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيَ الذُّنُوبَ الَّتِي تُنْزِلُ الْبَلاءَ
হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা বিপদ (বা কষ্ট) ডেকে আনে।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي كُلَّ ذَنْبٍ أَذْنَبْتُهُ
হে আল্লাহ! আমি যত গোনাহ করেছি সব ক্ষমা করে দাও।
وَ كُلَّ خَطِيئَةٍ أَخْطَأْتُهَا
এবং ভুল বশত: করা সকল ত্রুটি ক্ষমা করে দাও।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَتَقَرَّبُ إِلَيْكَ بِذِكْرِكَ
হে আল্লাহ! আমি তোমাকে স্মরণের (জিক্‌র) মাধ্যমে তোমার নৈকট্য লাভের সাধনা করি।
وَ أَسْتَشْفِعُ بِكَ إِلَى نَفْسِكَ
আমি তোমাকেই তোমার কাছে শাফায়াতের জন্য উপস্থিত করছি।
وَ أَسْأَلُكَ بِجُودِكَ أَنْ تُدْنِيَنِي مِنْ قُرْبِكَ
এবং আমি তোমার অনুগ্রহ নিয়ে তোমার কাছেই প্রার্থনা করছি আমাকে তোমার নৈকট্যেরও নিকটবর্তী করে নাও।
وَ أَنْ تُوزِعَنِي شُكْرَكَ وَ أَنْ تُلْهِمَنِي ذِكْرَكَ
এবং তোমাকে কিভাবে কৃতজ্ঞতা জানাবো আমাকে শিখিয়ে দাও এবং তোমার প্রতি মনোযোগ ও স্মরণকে আমার অন্তরে উদ্ভাসিত করো।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ سُؤَالَ خَاضِعٍ مُتَذَلِّلٍ خَاشِعٍ
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে নিবেদন জানাই পূর্ণ আনুগত্যে, বিনয়াবনত চিত্তে ও ভীত-বিহ্বল অন্তরে ।
أَنْ تُسَامِحَنِي وَ تَرْحَمَنِي وَ تَجْعَلَنِي بِقِسْمِكَ رَاضِيا قَانِعا
যেন আমার প্রতি তুমি ক্ষমাশীল ও দয়ার্দ্র হও এবং তোমার দেয়া বরাদ্দে খুশী ও পরিতৃপ্ত রাখো।
وَ فِي جَمِيعِ الْأَحْوَالِ مُتَوَاضِعا
এবং আমাকে যে কোন পরিস্থিতিতে বিনম্র ও বিনয়ী রাখো।
اللَّهُمَّ وَ أَسْأَلُكَ سُؤَالَ مَنِ اشْتَدَّتْ فَاقَتُهُ
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা জানাই এমন এক ব্যক্তির মতো যে চরম সংকটে নিপতিত হয়েছে।
وَ أَنْزَلَ بِكَ عِنْدَ الشَّدَائِدِ حَاجَتَهُ
এবং একমাত্র তোমার দরবারে তার যন্ত্রণা নিবারণের জন্য ভিক্ষা চাচ্ছে।
وَ عَظُمَ فِيمَا عِنْدَكَ رَغْبَتُهُ
এবং তোমার কাছে যে অনন্তকালীন নেয়ামত আছে তা তার আশাকে বহুগুণ বর্ধিত করেছে।
اللَّهُمَّ عَظُمَ سُلْطَانُكَ وَ عَلا مَكَانُكَ وَ خَفِيَ مَكْرُكَ
হে আল্লাহ! বিশাল তোমার সাম্রাজ্য এবং মহিমান্বিত তোমার মর্যাদা এবং তোমার পরিকল্পনা দৃশ্যাতীত।
وَ ظَهَرَ أَمْرُكَ وَ غَلَبَ قَهْرُكَ وَ جَرَتْ قُدْرَتُكَ
অস্তিত্বজগতে তোমার ক্ষমতা স্পষ্ট, তোমার শক্তি সবকিছুর উপর বিজয়ী, তোমার কর্তৃত্ব সর্বব্যাপী।
وَ لا يُمْكِنُ الْفِرَارُ مِنْ حُكُومَتِكَ
এবং অসম্ভব তোমার সাম্রাজ্য থেকে পলায়ন।
اللَّهُمَّ لا أَجِدُ لِذُنُوبِي غَافِرا وَ لا لِقَبَائِحِي سَاتِرا
হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া আমার পাপ ক্ষমা করার কিংবা আমার ঘৃণ্য কাজগুলো গোপন করে রাখার আর কেউ নেই।
وَ لا لِشَيْ‏ءٍ مِنْ عَمَلِيَ الْقَبِيحِ بِالْحَسَنِ مُبَدِّلا غَيْرَكَ
এবং আমার মন্দ কর্মগুলোকে সদ্‌গুণে রূপান্তরিত করার জন্যেও তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।
لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَ بِحَمْدِكَ
তুমি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই তুমি অতিশয় পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা তোমারই।
ظَلَمْتُ نَفْسِي وَ تَجَرَّأْتُ بِجَهْلِي
আমি আমার নিজের উপর জুলুম করেছি এবং আমার এ ধৃষ্টতা জন্মেছে আমার অজ্ঞতার কারণে ।
وَ سَكَنْتُ إِلَى قَدِيمِ ذِكْرِكَ لِي وَ مَنِّكَ عَلَيَّ
(পাপ করতে গিয়ে) আমি নির্ভর করেছিলাম আমার প্রতি তোমার অতীত দয়া এবং তোমার অনুগ্রহের উপর।
اللَّهُمَّ مَوْلايَ كَمْ مِنْ قَبِيحٍ سَتَرْتَهُ
হে আল্লাহ! আমার কত জঘন্য পাপকে তুমি গোপন করেছো।
وَ كَمْ مِنْ فَادِحٍ مِنَ الْبَلاءِ أَقَلْتَهُ [أَمَلْتَهُ‏]
এবং আমার কত কঠিন বিপদকে তুমি সহনীয় করে দিয়েছো।
وَ كَمْ مِنْ عِثَارٍ وَقَيْتَهُ وَ كَمْ مِنْ مَكْرُوهٍ دَفَعْتَهُ
এবং কত বিচ্যুতি হতে আমাকে তুমি রক্ষা করেছো, কত নোংরা কাজ হতে আমাকে দুরে রেখেছো।
وَ كَمْ مِنْ ثَنَاءٍ جَمِيلٍ لَسْتُ أَهْلا لَهُ نَشَرْتَهُ
এবং আমার অসংখ্য সুন্দর প্রশংসা তুমি চতুর্দিকে ছড়িয়েছো যার উপযুক্ত আমি ছিলাম না।
اللَّهُمَّ عَظُمَ بَلائِي وَ أَفْرَطَ بِي سُوءُ حَالِي وَ قَصُرَتْ [قَصَّرَتْ‏] بِي أَعْمَالِي
হে আল্লাহ! আমার যাতনা হয়েছে অসহনীয় এবং দুর্দশা অপরিমেয়, অপরাধপ্রবণতা তীব্র অথচ সৎকর্ম নগণ্য
أَعْمَالِي وَ قَعَدَتْ بِي أَغْلالِي وَ حَبَسَنِي عَنْ نَفْعِي بُعْدُ أَمَلِي [آمَالِي‏]
এবং [পার্থিব আসক্তির] শিকল আমাকে ধরাশায়ী করে রেখেছে। আর মিথ্যে আশার মরীচিকা আমাকে আমার কল্যাণ থেকে দুরে রেখেছে।
وَ خَدَعَتْنِي الدُّنْيَا بِغُرُورِهَا
এবং দুনিয়া তার মোহন মায়ায় আমাকে আবিষ্ট করেছে।
وَ نَفْسِي بِجِنَايَتِهَا [بِخِيَانَتِهَا] وَ مِطَالِي يَا سَيِّدِي
এবং আমার আপন সত্তা পরিণত হয়েছে বিশ্বাসঘাতকতা ও ছলনাপ্রবণতার শিকারে, হে আমার প্রভু!
فَأَسْأَلُكَ بِعِزَّتِكَ
তোমার মহত্ত্বের নামে আমি কাতর মিনতি জানাই।
أَنْ لا يَحْجُبَ عَنْكَ دُعَائِي سُوءُ عَمَلِي وَ فِعَالِي
আমার পাপ ও অপকর্মগুলো যেন আমার দোয়াকে তোমার দুয়ারে পৌঁছুতে বাধাগ্রস্ত না করে।
وَ لا تَفْضَحْنِي بِخَفِيِّ مَا اطَّلَعْتَ عَلَيْهِ مِنْ سِرِّي
এবং তুমি কিছুতেই তোমার জানা আমার গোপন বিষয়গুলো প্রকাশ করে দিয়ে আমাকে অপমানিত করো না ।
وَ لا تُعَاجِلْنِي بِالْعُقُوبَةِ عَلَى مَا عَمِلْتُهُ فِي خَلَوَاتِي مِنْ سُوءِ فِعْلِي
এবং সেসব গোপন অপকর্মের কারণে আমার শাস্তি ত্বরান্বিত করো না।
وَ إِسَاءَتِي وَ دَوَامِ تَفْرِيطِي وَ جَهَالَتِي
আমার ঐসব অপরাধ, পাপাচার, মহা অন্যায় ও অজ্ঞাতবশত: কর্মসমূহ।
وَ كَثْرَةِ شَهَوَاتِي وَ غَفْلَتِي
অতিরিক্ত লালসা ও গাফিলতির কারণে।
وَ كُنِ اللَّهُمَّ بِعِزَّتِكَ لِي فِي كُلِّ الْأَحْوَالِ [فِي الْأَحْوَالِ كُلِّهَا] رَءُوفا
হে আল্লাহ! আমি তোমার মহত্ত্বের উসিলায় তোমার কাছে নিবেদন জানাই সর্বাবস্থায় আমার প্রতি করুণাময় হতে।
وَ عَلَيَّ فِي جَمِيعِ الْأُمُورِ عَطُوفا
এবং প্রতিটি বিষয়ে আমার প্রতি সদয় দৃষ্টি দিতে।
إِلَهِي وَ رَبِّي مَنْ لِي غَيْرُكَ
হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! তুমি ছাড়া কি আর কেউ আছে
أَسْأَلُهُ كَشْفَ ضُرِّي وَ النَّظَرَ فِي أَمْرِي
যার কাছে আমি বিপদ মুক্তির আবেদন করতে কিংবা আমার সমস্যা অনুধাবনের প্রার্থনা জানাতে পারি ?
إِلَهِي وَ مَوْلايَ أَجْرَيْتَ عَلَيَّ حُكْما
হে আমার উপাস্য! হে আমার অভিভাবক! তুমি আমার (জীবনে চলার) জন্য বিধান নির্ধারণ করেছো
اتَّبَعْتُ فِيهِ هَوَى نَفْسِي
কিন্তু তার পরিবর্তে আমি আমার হীন কামনার দাসত্ব করেছি
وَ لَمْ أَحْتَرِسْ فِيهِ مِنْ تَزْيِينِ عَدُوِّي
এবং আমি শত্রুর প্ররোচনার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকিনি।
فَغَرَّنِي بِمَا أَهْوَى وَ أَسْعَدَهُ عَلَى ذَلِكَ الْقَضَاءُ
সে আমাকে নিরর্থক আশার মায়াজালে বেঁধে নিয়েছে যা আমাকে টেনে নিয়েছে অধঃপাতে এবং নিয়তি তাকে সহায়তা দিয়েছে এ কর্মে ।
فَتَجَاوَزْتُ بِمَا جَرَى عَلَيَّ مِنْ ذَلِكَ بَعْضَ [مِنْ نَقْضِ‏] حُدُودِكَ
এইভাবে আমি তোমার দেয়া ঐবিধানসমূহের কিছু কিছু বিষয়ে সীমালংঘন করেছি ।
وَ خَالَفْتُ بَعْضَ أَوَامِرِكَ
এবং তোমার কিছু কিছু আদেশ অমান্য করেছি ;
فَلَكَ الْحَمْدُ [الْحُجَّةُ] عَلَيَّ فِي جَمِيعِ ذَلِكَ
অতএব ঐ সমস্ত বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে তোমার (যথার্থ) অভিযোগ রয়েছে
وَ لا حُجَّةَ لِي فِيمَا جَرَى عَلَيَّ فِيهِ قَضَاؤُكَ
এবং আমার প্রতি তোমার রায়ের বিরুদ্ধে কোন অজুহাত আমার নেই
وَ أَلْزَمَنِي حُكْمُكَ وَ بَلاؤُكَ
তাই আমি (যথার্থভাবেই) তোমার বিচারের যোগ্য হয়েছি এবং শাস্তির উপযুক্ততা অর্জন করেছি ।
وَ قَدْ أَتَيْتُكَ يَا إِلَهِي بَعْدَ تَقْصِيرِي
এখন আমি অপরাধে অপরাধী হওয়ার পর তোমার দরবারে এসেছি, হে আমার প্রভু!
وَ إِسْرَافِي عَلَى نَفْسِي
আমি আমার উপর জুলুম করেছি।
مُعْتَذِرا نَادِما مُنْكَسِرا مُسْتَقِيلا مُسْتَغْفِرا مُنِيبا
ক্ষমাপ্রার্থী ও অনুতপ্ত হয়ে ভগ্ন হৃদয়ে নত হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করছি ।
مُقِرّا مُذْعِنا مُعْتَرِفا
তোমার কাছে প্রত্যাবর্তন করছি নতশিরে অপরাধ স্বীকার করে
لا أَجِدُ مَفَرّا مِمَّا كَانَ مِنِّي وَ لا مَفْزَعا
কেননা আমার কৃতকর্মের প্রতিফল ভোগ হতে মুক্তির কোন উপায় আমি দেখছি না । না কোন আশ্রয়স্থল দেখছি
أَتَوَجَّهُ إِلَيْهِ فِي أَمْرِي غَيْرَ قَبُولِكَ عُذْرِي
যেখানে আশ্রয় নেবো। একমাত্র তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো
وَ إِدْخَالِكَ إِيَّايَ فِي سَعَةِ [سَعَةٍ مِنْ‏] رَحْمَتِكَ
এবং তোমার অনন্ত করুণার রাজ্যে প্রবেশের অনুমতি ব্যতিরেকে আমার কোন পথও নেই।
اللَّهُمَّ [إِلَهِي‏] فَاقْبَلْ عُذْرِي وَ ارْحَمْ شِدَّةَ ضُرِّي وَ فُكَّنِي مِنْ شَدِّ وَثَاقِي
হে আল্লাহ! আমার তওবা কবুল করো এবং আমার তীব্র যাতনার উপর দয়ার্দ্র হও এবং আমাকে আমার (পাপকাজের) ভারী শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করো।
يَا رَبِّ ارْحَمْ ضَعْفَ بَدَنِي وَ رِقَّةَ جِلْدِي وَ دِقَّةَ عَظْمِي
হে পালনকর্তা! আমার দুর্বল শরীরের উপর দয়ার্দ্র হও এবং আমার কোমল ত্বক ও ভঙ্গুর হাড়গুলোর উপর করুণা করো।
يَا مَنْ بَدَأَ خَلْقِي وَ ذِكْرِي وَ تَرْبِيَتِي وَ بِرِّي وَ تَغْذِيَتِي
যে তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছো, আমাকে ব্যক্তিত্ব দিয়েছো এবং আমার সুষ্ঠ প্রতিপালন নিশ্চিত করেছো এবং আমাকে জীবিকা দিয়েছো
هَبْنِي لابْتِدَاءِ كَرَمِكَ وَ سَالِفِ بِرِّكَ بِي
দয়া করে আমার উপর তোমার সেই পরিমাণ রহমত ও বরকত বর্ষণ পুনরারম্ভ করো, যে পরিমাণ ছিলো আমার জীবনের সূচনালগ্নে ।
يَا إِلَهِي وَ سَيِّدِي وَ رَبِّي
হে আমার ইলাহ্‌! হে আমার মালিক! হে আমার প্রভু!
أَ تُرَاكَ مُعَذِّبِي بِنَارِكَ بَعْدَ تَوْحِيدِكَ
তুমি কি প্রজ্জ্বলিত অগ্নিতে আমাকে দগ্ধ হয়ে শাস্তি পেতে দেখবে যদিও আমি তোমার একত্বে বিশ্বাস স্থাপন করেছি?
وَ بَعْدَ مَا انْطَوَى عَلَيْهِ قَلْبِي مِنْ مَعْرِفَتِكَ
যদিও আমার অন্তর পরিপূর্ণ তোমার (পবিত্র) জ্ঞানে
وَ لَهِجَ بِهِ لِسَانِي مِنْ ذِكْرِكَ
এবং আমার জিহ্বা বারংবার তোমাকে যিকির করেছে
وَ اعْتَقَدَهُ ضَمِيرِي مِنْ حُبِّكَ
তোমার ভালবাসায় আমার অন্তর হয়েছে প্রেমার্ত ?
وَ بَعْدَ صِدْقِ اعْتِرَافِي
এবং যখন আমি তোমার কর্তৃত্বের কাছে একান্ত হৃদয়ে ভুল স্বীকার করেছি
وَ دُعَائِي خَاضِعا لِرُبُوبِيَّتِكَ
এবং বিনয়ের সাথে আকুল হৃদয়ে তোমাকে প্রতিপালক স্বীকার করেছি
هَيْهَاتَ أَنْتَ أَكْرَمُ مِنْ أَنْ تُضَيِّعَ مَنْ رَبَّيْتَهُ
না, যাকে তুমি নিজেই লালন-পালন করেছো তাকে ধ্বংস করা থেকে তুমি অনেক মহান
أَوْ تُبْعِدَ [تُبَعِّدَ] مَنْ أَدْنَيْتَهُ أَوْ تُشَرِّدَ مَنْ آوَيْتَهُ
কিংবা যাকে তুমি নিজেই রক্ষণাবেক্ষণ করেছো তাকে তোমার থেকে দুরে তাড়িয়ে দেয়া থেকে তুমি অনেক মহান
أَوْ تُسَلِّمَ إِلَى الْبَلاءِ مَنْ كَفَيْتَهُ وَ رَحِمْتَهُ
কিংবা যাকে তুমি আদর-যত্ম করেছো এবং যার প্রতি তুমি দয়ার্দ্র থেকেছো, তাকে যন্ত্রণার মাঝে ত্যাগ করে ফেলে রাখার মতো তুমি নও ।
وَ لَيْتَ شِعْرِي يَا سَيِّدِي وَ إِلَهِي وَ مَوْلايَ
হে আমার মালিক! আমার ইলাহ্‌ ! আমার প্রভু !
أَ تُسَلِّطُ النَّارَ عَلَى وُجُوهٍ خَرَّتْ لِعَظَمَتِكَ سَاجِدَةً
আমার জানতে ইচ্ছে করে তুমি কি ঐসব মুখকে অগ্নিতে প্রজ্জ্বলিত করবে যেসব মুখ তোমার মহত্ত্বের সম্মুখে সিজদাবনত হয়েছে
وَ عَلَى أَلْسُنٍ نَطَقَتْ بِتَوْحِيدِكَ صَادِقَةً
কিংবা ঐসব জিহ্বাকে যেগুলো একনিষ্ঠভাবে তোমার একত্ব ঘোষণা করেছে
وَ بِشُكْرِكَ مَادِحَةً وَ عَلَى قُلُوبٍ اعْتَرَفَتْ بِإِلَهِيَّتِكَ مُحَقِّقَةً
এবং সব সময় তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছে অথবা ঐ সব হৃদয়কে দগ্ধ-বিদগ্ধ করবে যেগুলো দৃঢ়তার সঙ্গে তোমার প্রভুত্বকে মেনে নিয়েছে
وَ عَلَى ضَمَائِرَ حَوَتْ مِنَ الْعِلْمِ بِكَ حَتَّى صَارَتْ خَاشِعَةً
কিংবা ঐ অন্তরসমূহ আগুনে ফেলবে, যেগুলো জ্ঞান ও পরিচিতির কারণে তোমার প্রতি অনুগত হয়েছে
وَ عَلَى جَوَارِحَ سَعَتْ إِلَى أَوْطَانِ تَعَبُّدِكَ طَائِعَةً
কিংবা ঐসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে প্রজ্জ্বলিত করবে যেগুলো তোমার ইবাদতের স্থানগুলোয় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আনুগত্যের জন্য যেতো
وَ أَشَارَتْ بِاسْتِغْفَارِكَ مُذْعِنَةً
এবং তোমার প্রতি আস্থা রেখে তোমার ক্ষমা ভিক্ষার কঠোর প্রয়াস চালিয়েছে ?
مَا هَكَذَا الظَّنُّ بِكَ
এ তোমার কাছ থেকে কিছুতেই আশা করা যায় না
وَ لا أُخْبِرْنَا بِفَضْلِكَ عَنْكَ يَا كَرِيمُ
কেননা তোমার থেকে এমন কোন বৈশিষ্ট্য আমরা দেখিনি হে দয়াবান ।
يَا رَبِّ وَ أَنْتَ تَعْلَمُ ضَعْفِي عَنْ قَلِيلٍ مِنْ بَلاءِ الدُّنْيَا وَ عُقُوبَاتِهَا
হে প্রতিপালক! তুমি তো জানো যে এ দুর্বলের জন্য এই দুনিয়ার সামান্য কষ্ট ও শাস্তিই কত অসহনীয়
وَ مَا يَجْرِي فِيهَا مِنَ الْمَكَارِهِ عَلَى أَهْلِهَا
আর সেখানে যা ঘটবে কি ভয়ানক অবস্থা হবে তার অধিবাসীদের উপর
عَلَى أَنَّ ذَلِكَ بَلاءٌ وَ مَكْرُوهٌ قَلِيلٌ مَكْثُهُ يَسِيرٌ بَقَاؤُهُ قَصِيرٌ مُدَّتُهُ
যদিও পৃথিবীর কষ্ট ও আযাব স্বল্পস্থায়ী সামান্য ও দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়
فَكَيْفَ احْتِمَالِي لِبَلاءِ الْآخِرَةِ وَ جَلِيلِ [حُلُولِ‏] وُقُوعِ الْمَكَارِهِ فِيهَا
তাহলে আমি কেমন করে পরকালের কষ্ট আর সেখানকার শাস্তি সইবো
وَ هُوَ بَلاءٌ تَطُولُ مُدَّتُهُ وَ يَدُومُ مَقَامُهُ
যে শাস্তির মেয়াদ দীর্ঘ, যেখানে অনন্তকাল অবস্থান করতে হবে।
وَ لا يُخَفَّفُ عَنْ أَهْلِهِ
যার অধিবাসীদের থেকে শাস্তি কমানো হবে না
لِأَنَّهُ لا يَكُونُ إِلا عَنْ غَضَبِكَ وَ انْتِقَامِكَ وَ سَخَطِكَ
কেননা এ শাস্তি একমাত্র তোমার ক্রোধ ও কঠোর ন্যায়বিচারের পরিণতি
وَ هَذَا مَا لا تَقُومُ لَهُ السَّمَاوَاتُ وَ الْأَرْضُ
যা আসমান ও জমিন সহ্য করতে অক্ষম?
يَا سَيِّدِي فَكَيْفَ لِي [بِي‏] وَ أَنَا عَبْدُكَ الضَّعِيفُ الذَّلِيلُ
হে প্রভু! তবে আমার কি হবে, যে আমি তোমার দুর্বল হীন বান্দা
الْحَقِيرُ الْمِسْكِينُ الْمُسْتَكِينُ يَا إِلَهِي وَ رَبِّي وَ سَيِّدِي وَ مَوْلايَ
ক্ষুদ্র, নগণ্য ও ম্রিয়মান দাসানুদাস? হে আমার উপাস্য! আমার মালিক! আমার প্রভু! আমার পালনকর্তা!
لِأَيِّ الْأُمُورِ إِلَيْكَ أَشْكُو
কোন্‌ বিষয়ে আমি তোমার কাছে অভিযোগ জানাবো
وَ لِمَا مِنْهَا أَضِجُّ وَ أَبْكِي
আর কোনটা নিয়ে আমি অশ্রু ঝরাবো, আর বিলাপ করবো
لِأَلِيمِ الْعَذَابِ وَ شِدَّتِهِ أَمْ لِطُولِ الْبَلاءِ وَ مُدَّتِهِ
শাস্তির যাতনা ও তার তীব্রতার জন্য নাকি শাস্তির মেয়াদের দীর্ঘতার জন্যে ?
فَلَئِنْ صَيَّرْتَنِي لِلْعُقُوبَاتِ مَعَ أَعْدَائِكَ
অতএব যদি তুমি আমাকে তোমার শত্রুদের সাথে শাস্তি দিতে নিয়ে যাও
وَ جَمَعْتَ بَيْنِي وَ بَيْنَ أَهْلِ بَلائِكَ
এবং তোমার আযাব ভোগকারী লোকদের সাথে আমাকেও একত্র করো
وَ فَرَّقْتَ بَيْنِي وَ بَيْنَ أَحِبَّائِكَ وَ أَوْلِيَائِكَ
আর তোমার প্রেমিক ও অলী-আওলীয়াদের কাছ থেকে আমাকে পৃথক করে নাও
فَهَبْنِي يَا إِلَهِي وَ سَيِّدِي وَ مَوْلايَ وَ رَبِّي
তাহলে হে আমার উপাস্য! হে আমার মালিক! হে আমার অভিভাবক! হে প্রতিপালক!
صَبَرْتُ عَلَى عَذَابِكَ فَكَيْفَ أَصْبِرُ عَلَى فِرَاقِكَ
আমি তোমার এ শাস্তি সয়ে নেবো, কিন্তু তোমার থেকে এ বিচ্ছিন্নতা আমি কীভাবে সহ্য করবো ?
وَ هَبْنِي [يَا إِلَهِي‏] صَبَرْتُ عَلَى حَرِّ نَارِكَ
কিংবা ধরা যাক আমি তোমার আগুনের প্রজ্জ্বলন সইতে পারলাম
فَكَيْفَ أَصْبِرُ عَنِ النَّظَرِ إِلَى كَرَامَتِكَ
কিন্তু কেমন করে আমি তোমার ক্ষমা ও দয়ার বঞ্চনা সয়ে নেবো?
أَمْ كَيْفَ أَسْكُنُ فِي النَّارِ وَ رَجَائِي عَفْوُك
কেমন করে আমি আগুনের মাঝে বসবাস করবো যখন তোমার ক্ষমার উপর ভরসা করে আমি আশায় বুক বেঁধেছি?
فَبِعِزَّتِكَ يَا سَيِّدِي وَ مَوْلايَ
হে আমার প্রভু! আমার অভিভাবক! তোমার মহামর্যাদার শপথ
أُقْسِمُ صَادِقا لَئِنْ تَرَكْتَنِي نَاطِقا
আমি বিশ্বস্ত অন্তরের শপথ করে বলছি, তুমি যদি দোজখের আগুনের মধ্যেও আমার বাক্‌শক্তি রক্ষা কর
لَأَضِجَّنَّ إِلَيْكَ بَيْنَ أَهْلِهَا ضَجِيجَ الْآمِلِينَ [الْآلِمِينَ‏
তাহলেও আমি সেখান থেকে একজন দৃঢ় আশাবাদীর মতো আশা নিয়েই তোমার কাছে কাতর আকুতি জানাতে থাকবো।
لَأَصْرُخَنَّ إِلَيْكَ صُرَاخَ الْمُسْتَصْرِخِينَ
আমি তোমার কাছে একজন সহায়হীনের মতোই সাহায্য প্রার্থনা করবো
وَ لَأَبْكِيَنَّ عَلَيْكَ بُكَاءَ الْفَاقِدِينَ
একজন নিঃস্ব ব্যক্তির মতোই আমি তোমার কাছে আকুল হয়ে কাঁদবো
وَ لَأُنَادِيَنَّكَ أَيْنَ كُنْتَ يَا وَلِيَّ الْمُؤْمِنِينَ
আর তোমাকে ডাক ছেড়ে বলবো, হে মু'মিনদের অভিভাবক তুমি কোথায় ?
يَا غَايَةَ آمَالِ الْعَارِفِينَ يَا غِيَاثَ الْمُسْتَغِيثِينَ
হে সাধকদের সাধনার চুড়ান্ত লক্ষ্য, হে সাহায্য প্রার্থীদের সাহায্যকারী
يَا حَبِيبَ قُلُوبِ الصَّادِقِينَ وَ يَا إِلَهَ الْعَالَمِينَ
হে সত্যপথিকদের প্রাণপ্রিয় প্রেমিক, হে জগতসমূহের প্রভু, কোথায় তুমি ?
أَ فَتُرَاكَ سُبْحَانَكَ يَا إِلَهِي
হে খোদা! তুমি সমস্তকিছু থেকে অতিশয় পবিত্র
وَ بِحَمْدِكَ تَسْمَعُ فِيهَا صَوْتَ عَبْدٍ مُسْلِمٍ سُجِنَ [يُسْجَنُ‏] فِيهَا بِمُخَالَفَتِهِ
আর সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই, তুমি কি একবারও ফিরে দেখবে না যে, একজন আত্মসমর্পণকারী দাস তার অবাধ্যতার কারণে দোযখের আগুনে বন্দী
وَ ذَاقَ طَعْمَ عَذَابِهَا بِمَعْصِيَتِهِ
এবং অন্যায় আচরণের কারণে এর শাস্তি ভোগ করছে
وَ حُبِسَ بَيْنَ أَطْبَاقِهَا بِجُرْمِهِ وَ جَرِيرَتِهِ
আর পাপ ও অপরাধের কারণে সে জাহান্নামের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে
وَ هُوَ يَضِجُّ إِلَيْكَ ضَجِيجَ مُؤَمِّلٍ لِرَحْمَتِكَ
তোমার দয়ার উপর দৃঢ় আস্থা নিয়ে তোমার প্রতি সুতীব্র আবেদন জানাচ্ছে।
وَ يُنَادِيكَ بِلِسَانِ أَهْلِ تَوْحِيدِكَ
তোমার তাওহীদে দৃঢ় বিশ্বাসী ব্যক্তির মতো তোমাকে ডাকছে
وَ يَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِرُبُوبِيَّتِكَ يَا مَوْلايَ
এবং তোমার প্রভুত্বের প্রতি ভরসা করে তোমার প্রতি চেয়ে আছে, হে আমার অধিকর্তা!
فَكَيْفَ يَبْقَى فِي الْعَذَابِ وَ هُوَ يَرْجُو مَا سَلَفَ مِنْ حِلْمِكَ
তোমার অতীত ক্ষমা, অনুকম্পা ও রহমতের উপর পূর্ণ ভরসা রাখার পরও কেমন করে সেই বান্দা কঠিন আযাবের মাঝে নিমজ্জিত থাকবে ?
أَمْ كَيْفَ تُؤْلِمُهُ النَّارُ وَ هُوَ يَأْمُلُ فَضْلَكَ وَ رَحْمَتَكَ
কিংবা কেমন করে দোযখের আগুন তাকে কষ্ট দিবে যখন সে তোমার মহত্ব ও দয়ার প্রতি বুক বেঁধে আছে?
أَمْ كَيْفَ يُحْرِقُهُ لَهِيبُهَا وَ أَنْتَ تَسْمَعُ صَوْتَهُ
কিংবা কেমন করে দোযখের আগুনের লেলিহান শিখায় সে প্রজ্বলিত হবে অথচ তুমি তার আর্তনাদ শুনতে পাবে?
وَ تَرَى مَكَانَهُ أَمْ كَيْفَ يَشْتَمِلُ عَلَيْهِ زَفِيرُهَا
এবং আগুনের মধ্যে তাকে দেখতে পাবে তাহলে কিভাবে আগুনের শিখা তাকে গ্রাস করে নিবে?
وَ أَنْتَ تَعْلَمُ ضَعْفَهُ أَمْ كَيْفَ يَتَقَلْقَلُ بَيْنَ أَطْبَاقِهَا
অথচ তুমি তো জানো সে কি ভীষণ দুর্বল তাহলে কিভাবে সে দোযখের স্তরগুলোর চাপে নিষ্পিষ্ট হতে থাকবে?
وَ أَنْتَ تَعْلَمُ صِدْقَهُ أَمْ كَيْفَ تَزْجُرُهُ زَبَانِيَتُهَا
তুমি তো তার নিষ্ঠার কথা জানো তাহলে কেমন করে দোযখের প্রহরীরা তাকে কষ্ট দেবে
وَ هُوَ يُنَادِيكَ يَا رَبَّهْ
অথচ সে কেবলই ডাকছে ‘ইয়া রব্ব'! ‘ইয়া রব্ব'! বলে ?
أَمْ كَيْفَ يَرْجُو فَضْلَكَ فِي عِتْقِهِ مِنْهَا فَتَتْرُكُهُ [فَتَتْرُكَهُ‏] فِيهَا
কেমন করে তুমি তাকে ফেলে রাখবে (দোযখের মাঝে) যখন তার দৃঢ় বিশ্বাস যে, তোমার অপার করুণা তাকে এখান থেকে মুক্ত করবে?
هَيْهَاتَ مَا ذَلِكَ الظَّنُّ بِكَ
হায়! এমনটা তোমার কাছে কখনো আশা করা যায় না ।
وَ لا الْمَعْرُوفُ مِنْ فَضْلِكَ
তোমার করুণার রূপও এমনটা নয়
وَ لا مُشْبِهٌ لِمَا عَامَلْتَ بِهِ الْمُوَحِّدِينَ مِنْ بِرِّكَ وَ إِحْسَانِكَ
কিংবা তোমার একত্বে বিশ্বাসীদের প্রতি তুমি যে করুণা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করো তার সাথেও এর কোন মিল নেই
فَبِالْيَقِينِ أَقْطَعُ لَوْ لا مَا حَكَمْتَ بِهِ مِنْ تَعْذِيبِ جَاحِدِيكَ
অতএব আমি নিশ্চিত হয়ে ঘোষণা করছি যে, যদি তুমি অবিশ্বাসীদের জন্য শাস্তি নির্ধারণ না করতে
وَ قَضَيْتَ بِهِ مِنْ إِخْلادِ مُعَانِدِيكَ
এবং তোমার শত্রুদের আবাস হিসাবে দোযখকে নির্ধারিত না করতে
لَجَعَلْتَ النَّارَ كُلَّهَا بَرْدا وَ سَلاما
তাহলে তুমি দোযখকে শীতল ও প্রশান্তিময় করে তুলতে
وَ مَا كَانَ [كَانَتْ‏] لِأَحَدٍ فِيهَا مَقَرّا وَ لا مُقَاما [مَقَاما]
এবং কোন মানুষকেই দোযখে থাকতে ও বসবাস করতে হতো না ;
لَكِنَّكَ تَقَدَّسَتْ أَسْمَاؤُكَ
অথচ পবিত্র তোমার নামসমূহ
أَقْسَمْتَ أَنْ تَمْلَأَهَا مِنَ الْكَافِرِينَ
তুমি শপথ করেছো যে অবিশ্বাসীদের দিয়ে দোযখ পূর্ণ করবে
مِنَ الْجِنَّةِ وَ النَّاسِ أَجْمَعِينَ
জ্বিন ও মানুষের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী
وَ أَنْ تُخَلِّدَ فِيهَا الْمُعَانِدِينَ
এবং একে তোমার বিরুদ্ধবাদীদের চিরস্থায়ী নিবাসে পরিণত করবে
وَ أَنْتَ جَلَّ ثَنَاؤُكَ قُلْتَ مُبْتَدِئا وَ تَطَوَّلْتَ بِالْإِنْعَامِ مُتَكَرِّما
আর মহিমান্বিত তোমার গুণাবলী তুমি নিজেই সূচনালগ্নে তোমার অপার অনুগ্রহে তুমি ঘোষণা করেছো, সমগ্র সৃষ্টিকে তুমি নেয়ামত ও করুণা দিয়েছো।
أَ فَمَنْ كَانَ مُؤْمِنا كَمَنْ كَانَ فَاسِقا لا يَسْتَوُونَ
একজন মুমিন আর একজন দুর্নীতিপরায়ণ মানুষ কি সমান? তারা সমান হতে পারে না
إِلَهِي وَ سَيِّدِي فَأَسْأَلُكَ بِالْقُدْرَةِ الَّتِي قَدَّرْتَهَا
হে আমার প্রভু ও অভিভাবক! তোমার কাছে আমি প্রার্থনা করছি তোমার ঐ শক্তির নামে যা সমগ্রবিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করে
وَ بِالْقَضِيَّةِ الَّتِي حَتَمْتَهَا وَ حَكَمْتَهَا
এবং তোমার চূড়ান্ত ও কার্যকরী শক্তির নামে
وَ غَلَبْتَ مَنْ عَلَيْهِ أَجْرَيْتَهَا
এবং যা দ্বারা তুমি সবকিছুর উপর সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর কর
أَنْ تَهَبَ لِي فِي هَذِهِ اللَّيْلَةِ وَ فِي هَذِهِ السَّاعَةِ
দয়া করে আমাকে এই রাতের এই প্রহরে ক্ষমা করে দাও
كُلَّ جُرْمٍ أَجْرَمْتُهُ وَ كُلَّ ذَنْبٍ أَذْنَبْتُهُ
আমি যেসব অপরাধে অপরাধী এবং যেসব পাপে পাপী হয়েছি
وَ كُلَّ قَبِيحٍ أَسْرَرْتُهُ وَ كُلَّ جَهْلٍ عَمِلْتُهُ
সেই সমস্ত ঘৃণ্য কাজের জন্য যা আমি গোপন রেখেছি, সেই সমস্ত প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অপকর্মের জন্য যা আমি করেছি
كَتَمْتُهُ أَوْ أَعْلَنْتُهُ أَخْفَيْتُهُ أَوْ أَظْهَرْتُهُ
অন্ধকারে কিংবা দিবালোকে এবং যা স্বীকার কিংবা অস্বীকার করেছি
وَ كُلَّ سَيِّئَةٍ أَمَرْتَ بِإِثْبَاتِهَا الْكِرَامَ الْكَاتِبِينَ
এবং সেই সকল মন্দ কাজের জন্য যা লিপিবদ্ধ হয়েছে সম্মানিত লিপিকারদের দ্বারা যাদের তুমি আদেশ করেছো
الَّذِينَ وَكَّلْتَهُمْ بِحِفْظِ مَا يَكُونُ مِنِّي
যাদের তুমি দায়িত্ব দিয়েছো আমার সমস্ত ক্রিয়া-কর্ম লিপিবদ্ধ করতে
وَ جَعَلْتَهُمْ شُهُودا عَلَيَّ مَعَ جَوَارِحِي
এবং তাদেরকে তুমি নিয়োগ করেছো আমার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো আমার কার্যকলাপের সাক্ষী হতে
وَ كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيَّ مِنْ وَرَائِهِمْ
এবং ঐসকল ফেরেশতাদের উর্ধ্বে তুমি নিজেই আমার কার্যকলাপের মহাপর্যবেক্ষক
وَ الشَّاهِدَ لِمَا خَفِيَ عَنْهُمْ وَ بِرَحْمَتِكَ أَخْفَيْتَهُ
এবং তোমার অশেষ করুণায় তুমি যেসব মন্দ কর্ম ওদের কাছে গোপন রাখো তার সবই তো তোমার কাছে পরিষ্কার
وَ بِفَضْلِكَ سَتَرْتَهُ وَ أَنْ تُوَفِّرَ حَظِّي
এবং তোমার মহত্বের দ্বারা পরিবৃত করেছো [আমার অপরাধগুলো] এবং আমাকে একটি বিরাট অংশ দান করো।
مِنْ كُلِّ خَيْرٍ أَنْزَلْتَهُ [تُنْزِلُهُ‏]
তোমার দেওয়া প্রতিটি কল্যাণ হতে
أَوْ إِحْسَانٍ فَضَّلْتَهُ [تُفَضِّلُهُ‏]
এবং প্রতিটি সুমহান অনুগ্রহ
أَوْ بِرٍّ نَشَرْتَهُ [تَنْشُرُهُ‏] أَوْ رِزْقٍ بَسَطْتَهُ [تَبْسُطُهُ‏]
এবং যেসব কল্যাণ তুমি প্রকাশ ঘটিয়েছো ও প্রতিটি জীবিকা যা তুমি বৃদ্ধি করেছো
] أَوْ ذَنْبٍ تَغْفِرُهُ أَوْ خَطَإٍ تَسْتُرُهُ
এবং যেসব অপরাধ তুমি ক্ষমা করবে ও ত্রুটিসমূহ তুমি গোপন করে রাখবে।
‏ يَا رَبِّ يَا رَبِّ يَا رَبِّ
"ইয়া রব্ব"! "ইয়া রব্ব"! "ইয়া রব্ব"!
يَا إِلَهِي وَ سَيِّدِي وَ مَوْلايَ وَ مَالِكَ رِقِّي
হে উপাস্য প্রভু! হে মনিব! হে মাওলা! হে আমার মুক্তির মালিক
يَا مَنْ بِيَدِهِ نَاصِيَتِي
হে যিনি আমার ভাগ্য নিয়ন্ত্রক
يَا عَلِيما بِضُرِّي [بِفَقْرِي‏] وَ مَسْكَنَتِي يَا خَبِيرا بِفَقْرِي وَ فَاقَتِي
হে যিনি আমার যাতনা ও নিঃস্বতা সম্পর্কে পরিজ্ঞাত, যিনি আমার দুঃসহায়তা ও অনাহার সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন
يَا رَبِّ يَا رَبِّ يَا رَبِّ
"ইয়া রব্ব"! "ইয়া রব্ব"! "ইয়া রব্ব"!
أَسْأَلُكَ بِحَقِّكَ وَ قُدْسِكَ وَ أَعْظَمِ صِفَاتِكَ وَ أَسْمَائِكَ
তোমার মহামর্যাদা ও বিশুদ্ধ সত্তা এবং পরিপূর্ণ নিখুঁত গুণাবলী ও নাম সমূহের উসিলায় আমি তোমার কাছে মিনতি করছি ।
أَنْ تَجْعَلَ أَوْقَاتِي مِنَ [فِي‏] اللَّيْلِ وَ النَّهَارِ بِذِكْرِكَ مَعْمُورَةً
আমার সমস্ত প্রহর, দিবা ও রাত্রি যেন তোমাকে স্মরণের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়
وَ بِخِدْمَتِكَ مَوْصُولَةً وَ أَعْمَالِي عِنْدَكَ مَقْبُولَةً
এবং একাধারে যেন তোমার উপাসনায় থাকতে পারি এবং আমার সকল কর্মকে তোমার গ্রহণযোগ্য করে তোলো
حَتَّى تَكُونَ أَعْمَالِي وَ أَوْرَادِي [إِرَادَتِي‏] كُلُّهَا وِرْدا وَاحِدا
যেন আমার আচরণ ও কথোপকথন সবই একই লক্ষ্যে বিশুদ্ধভাবে তোমার জন্যই সম্পাদিত হয়
وَ حَالِي فِي خِدْمَتِكَ سَرْمَدا
এবং আমার সমগ্রজীবন যেন ব্যয়িত হয় তোমার আনুগত্য চর্চায়।
يَا سَيِّدِي يَا مَنْ عَلَيْهِ مُعَوَّلِي يَا مَنْ إِلَيْهِ شَكَوْتُ أَحْوَالِي
হে আমার মালিক! যার উপর আমার সমস্ত ভরসা, যার কাছে আমি আমার সমস্ত দুর্দশার কথা খুলে বলি
يَا رَبِّ يَا رَبِّ يَا رَبِّ
"ইয়া রব্ব"! "ইয়া রব্ব"! "ইয়া রব্ব"!
قَوِّ عَلَى خِدْمَتِكَ جَوَارِحِي وَ اشْدُدْ عَلَى الْعَزِيمَةِ جَوَانِحِي
তোমার দাসত্বের জন্য আমার দেহকে শক্তিশালী করে তোলো এবং লক্ষ্যের প্রতি আমার মনোবলকে দৃঢ় রাখো ;
وَ هَبْ لِيَ الْجِدَّ فِي خَشْيَتِكَ
আর আমার মধ্যে প্রদান কর খোদাভীতি
وَ الدَّوَامَ فِي الاتِّصَالِ بِخِدْمَتِكَ
এবং সর্বক্ষণ তোমার খেদমতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা
حَتَّى أَسْرَحَ إِلَيْكَ فِي مَيَادِينِ السَّابِقِينَ
যেন আমি তোমাকে আনুগত্যের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তীদের চেয়ে অগ্রগামী হয়ে তোমার পানে অগ্রসর হতে পারি
وَ أُسْرِعَ إِلَيْكَ فِي الْبَارِزِينَ [الْمُبَادِرِينَ‏]
এবং তোমার দিকে ধাবমান সকল দ্রুতগামীর চেয়ে দ্রুততর তোমার কাছে পৌঁছাতে পারি
وَ أَشْتَاقَ إِلَى قُرْبِكَ فِي الْمُشْتَاقِينَ
আর যারা একাগ্রনিষ্ঠায় তোমার নৈকট্য লাভ করেছে তাদের মতোই যেন আমি নিজেকে তোমার নৈকট্য লাভের সাধনায় নিয়োজিত করতে পারি
‏ وَ أَدْنُوَ مِنْكَ دُنُوَّ الْمُخْلِصِينَ
এবং বিশুদ্ধ ব্যক্তিদের মতোই যেন আমি তোমার নৈকট্যপ্রাপ্ত হতে পারি
وَ أَخَافَكَ مَخَافَةَ الْمُوقِنِينَ
এবং বিশ্বস্ত মনের অধিকারীগণ যেভাবে তোমাকে ভয় করে আমিও যেন সেভাবে ভয়ে চলতে পারি
وَ أَجْتَمِعَ فِي جِوَارِكَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ
এবং আমি যেন মুমিনদের সাথে তোমার অপার করুণার ছায়াতলে থাকতে পারি।
اللَّهُمَّ وَ مَنْ أَرَادَنِي بِسُوءٍ فَأَرِدْهُ
হে আল্লাহ্‌ ! যে আমার অনিষ্ট চায় তুমি তারই অনিষ্ট কর !
وَ مَنْ كَادَنِي فَكِدْهُ
আর যে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাকেই ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত কর !
وَ اجْعَلْنِي مِنْ أَحْسَنِ عَبِيدِكَ نَصِيبا عِنْدَكَ
এবং আমাকে তোমার শ্রেষ্ঠ দাসদের সঙ্গে স্থান দান কর যা তোমার অনুগ্রহ ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়
وَ أَقْرَبِهِمْ مَنْزِلَةً مِنْكَ وَ أَخَصِّهِمْ زُلْفَةً لَدَيْكَ
এবং আমাকে দান কর তোমার সর্বনিকটতম দাসদের ও একান্ত বিশেষ বান্দাদের অবস্থান
فَإِنَّهُ لا يُنَالُ ذَلِكَ إِلا بِفَضْلِكَ
নিশ্চয় তোমার অনুগ্রহ ও করুণা ব্যতীত এ স্থান লাভ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়
وَ جُدْ لِي بِجُودِكَ وَ اعْطِفْ عَلَيَّ بِمَجْدِكَ
তোমার অনুগ্রহ থেকে আমাকে [ক্ষমা] দান কর এবং তোমার নিঃশর্ত করুণা থেকে আমাকে বঞ্চিত করো না
وَ احْفَظْنِي بِرَحْمَتِكَ وَ اجْعَلْ لِسَانِي بِذِكْرِكَ لَهِجا
এবং তোমার অপার করুণায় আমাকে [দুনিয়া ও আখেরাতে] রক্ষা কর এবং আমার জিহ্বাকে সর্বক্ষণ তোমার গুণকীর্তনে পরিচালিত করো
وَ قَلْبِي بِحُبِّكَ مُتَيَّما
এবং আমার অন্তর যেন তোমার প্রেমে কাতর ও অস্থির হয়ে ওঠে
وَ مُنَّ عَلَيَّ بِحُسْنِ إِجَابَتِكَ
করুণা কর আমার প্রতি একটি দয়ার্দ্র প্রত্যুত্তর দিয়ে
وَ أَقِلْنِي عَثْرَتِي وَ اغْفِرْ زَلَّتِي
আমার পদস্খলনগুলো মুছে দাও এবং আমার ত্রুটিগুলো মার্জনা করে দাও!
فَإِنَّكَ قَضَيْتَ عَلَى عِبَادِكَ بِعِبَادَتِكَ
কেননা তুমিই তো তোমার বান্দাদের জন্য দয়া করে নির্ধারণ করেছো উপাসনাকে
وَ أَمَرْتَهُمْ بِدُعَائِكَ وَ ضَمِنْتَ لَهُمُ الْإِجَابَةَ
আদেশ করেছো প্রার্থনা জানাতে এবং নিশ্চয়তা দিয়েছো এসবের জবাব দানের
فَإِلَيْكَ يَا رَبِّ نَصَبْتُ وَجْهِي
তাই তোমার পানেই হে প্রতিপালক আমি মুখ ফিরিয়েছি
وَ إِلَيْكَ يَا رَبِّ مَدَدْتُ يَدِي
এবং তোমার দিকে ভিক্ষার হাত উঠিয়েছি, হে প্রতিপালক!
فَبِعِزَّتِكَ اسْتَجِبْ لِي دُعَائِي
অতএব তোমার মহামর্যাদার উসিলায় আমার দোয়া কবুল কর
وَ بَلِّغْنِي مُنَايَ وَ لا تَقْطَعْ مِنْ فَضْلِكَ رَجَائِي
এবং আমার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ কর। কিছুতেই আমাকে হতাশ করো না
وَ اكْفِنِي شَرَّ الْجِنِّ وَ الْإِنْسِ مِنْ أَعْدَائِي
এবং তুমি আমায় রক্ষা কর জ্বীন ও মানুষের মধ্যে যারা আমার শত্রু তাদের অনিষ্ট হতে
يَا سَرِيعَ الرِّضَا اغْفِرْ لِمَنْ لا يَمْلِكُ إِلا الدُّعَاءَ
হে [প্রভু ] যে তুমি দ্রুত সন্তুষ্ট হও! তাকে তুমি ক্ষমা কর দোয়া ছাড়া যার অন্য কোন সম্বল নেই
فَإِنَّكَ فَعَّالٌ لِمَا تَشَاءُ يَا مَنِ اسْمُهُ دَوَاءٌ
কেননা তোমার যা ইচ্ছা তুমি তো তাই করতে পার। হে [প্রভু ] যার নামে দূর্গতির মুক্তি
وَ ذِكْرُهُ شِفَاءٌ وَ طَاعَتُهُ غِنًى
যার স্মরণেই সমস্ত কষ্টের প্রতিকার এবং যার আনুগত্যেই সম্পদ
ارْحَمْ مَنْ رَأْسُ مَالِهِ الرَّجَاءُ وَ سِلاحُهُ الْبُكَاءُ
রহম করো তার উপর যার মূলধন শুধু আশা আর অবলম্বন শুধুই কান্না
يَا سَابِغَ النِّعَمِ يَا دَافِعَ النِّقَمِ
হে সমস্ত নেয়ামতের পূর্ণতাদানকারী ও সমস্ত দুর্যোগের ত্রাণকর্তা
يَا نُورَ الْمُسْتَوْحِشِينَ فِي الظُّلَمِ
হে অন্ধকারে পথভ্রান্ত একাকীদের দিশা আলোক!
الظُّلَمِ يَا عَالِما لا يُعَلَّمُ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ آلِ مُحَمَّدٍ
হে সর্বজ্ঞ! যাকে কখনো শিখানো হয়নি! মুহাম্মদ ও তাঁর বংশধরদের উপর শান্তি বর্ষণ করো
وَ افْعَلْ بِي مَا أَنْتَ أَهْلُهُ
এবং আমার প্রতি তা-ই করো যা করা তোমাকে মানায়
وَ صَلَّى اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ وَ الْأَئِمَّةِ الْمَيَامِينِ مِنْ آلِهِ [أَهْلِهِ‏] وَ سَلَّمَ تَسْلِيما [كَثِيرا]
শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর রাসূলের উপর এবং তাঁর বংশধরদের মধ্য হতে পবিত্র ইমামদের উপর এবং তাঁদের দান করো অপার ও অসীম প্রশান্তি ।

যাকাত

যাকাত- ইসলামের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিধান। কুরআন শরীফে আল্লাহ তা'আলা যখনই নামায আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, পাশাপাশি অধিকাংশ ক্ষেত্রে যাকাত আদায়েরও নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, "নামায কায়েম করো এবং যাকাত আদায় করো"। [দেখুন- ২:৪৩, ২:৮৩, ২:১১০, ২৪:৫৬, ৫৮:১৩ -ইত্যাদি আয়াতগুলো।]
এসব আয়াতের আলোকে যাকাত ইসলামের অন্যতম অপরিহার্য ফরয দায়িত্ব বলে প্রমাণিত হয়; যার অস্বীকারকারী বা তুচ্ছ তাচ্ছিল্লকারী কাফির বলে গণ্য; আর অনাদায়কারী ফাসিক এবং কঠিন শাস্তির যোগ্য। অথচ এ বিধানটাকে আমরা কতই না অবহেলা করি! কুরআনের শরীফের একেবারে শুরুর দিকে, সূরা বাক্বারায়, হেদায়াতপ্রাপ্ত মুত্তাকীদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, "...আমার দেয়া রিযক হতে যাকাত প্রদান করে"। এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর ভয় অন্তরে লালন করা ও হেদায়াতের পূর্ণতায় পৌঁছুতে যাকাত প্রদানের কোনো বিকল্প নেই। যে ব্যক্তি যাকাত ফরয হওয়ার পরও তা আদায় করে না, তার পক্ষে পূর্ণ হেদায়াত লাভ করা কখনো সম্ভব নয়। ভাবতে পারেন, হেদায়াত না-ই পেলাম, হেদায়াত আমার কি-ই-বা দরকার; আতর লাগিয়ে শুক্রবার নামাযে যাচ্ছি; সেজেগুজে ঈদের নামাযে হাজিরা যাচ্ছি; ব্যাস.. মুসলমানের দায়িত্ব তো পালন হলোই; বেহেশত তো পাচ্ছিই; হুর-গেলমান তো থাকবেই; ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু না... যাকাত প্রদান করলে যেমন পাচ্ছেন হেদায়াত ও আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য, ঠিক তেমনিভাবে, না আদায় করলেও প্রস্তুত থাকছে ভয়ানক শাস্তি। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ - يَوْمَ يُحْمَىٰ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ ۖ هَٰذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ "আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহ্র পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে। (সেদিন বলা হবে), এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখার"। [৯:৩৪-৩৫] ত্রিশতম পারার সূরা হুমাযা পুরোটাই যাকাত প্রদান না করার শাস্তির আলোচনায় উৎসর্গিত। দেখুন, وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ - الَّذِي جَمَعَ مَالًا وَعَدَّدَهُ - يَحْسَبُ أَنَّ مَالَهُ أَخْلَدَهُ - كَلَّا ۖ لَيُنْبَذَنَّ فِي الْحُطَمَةِ - وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْحُطَمَةُ - نَارُ اللَّهِ الْمُوقَدَةُ - الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ - إِنَّهَا عَلَيْهِمْ مُؤْصَدَةٌ - فِي عَمَدٍ مُمَدَّدَةٍ "প্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ,যে অর্থ সঞ্চিত করে ও গণনা করে। সে মনে করে যে,তার অর্থ চিরকাল তার সাথে থাকবে। কখনও না,সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে পিষ্টকারীর মধ্যে। আপনি কি জানেন,পিষ্টকারী কি ? এটা আল্লাহ্র প্রজ্বলিত অগ্নি,যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছবে। এতে তাদেরকে বেঁধে দেয়া হবে,লম্বালম্বি খুঁটিতে"। [১০৪:১-৯] বস্তুত, সীমিত পর্যায়ে ব্যক্তি মালিকানাকে ইসলাম স্বীকার করে নিলেও, এ সুযোগে যেন অশুভ পুঁজিতন্ত্র জন্ম লাভ না করতে পারে, সে বিষয়েও সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। পুঁজিতন্ত্রের বিকাশ রোধে তাই যাকাতকে গুরুত্ব দিয়েছে অনেক বেশি। ইসলাম মনে করে, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বাদ দেয়ার পর কারো যদি ৫২.৫ তোলা রূপা বা ৭.৫ তোলা স্বর্ণ বা সমমূল্যের সম্পদ এক বৎসর কাল পর্যন্ত সঞ্চিত থাকে, তাহলে সে সম্পদশালী। এ ধরনের সম্পদশালী ব্যক্তিদের থেকে রাষ্ট্রের অন্যান্য অভাবী মানুষদের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য ঐ সঞ্চিত সম্পদের শতকরা ২.৫ টাকা যাকাত প্রদানের দাবি জানায় ইসলাম। যাকাত আদায়ের বিবিধ উপকারিতা নিম্নরূপ: ১. গরীবের প্রয়োজন পূর্ণ করা; অভিশপ্ত পুঁজিতন্ত্রের মূলোৎপাটন করা; সম্পদ কুক্ষিগত করার মানসিকতাকে শেষ করে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করা। ২. মুসলমানদের সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধি করা; দারিদ্র বিমোচনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ৩. চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই সহ সবরকম অভাবজনিত অপরাধের মূলোৎপাটন করা। গরীব-ধনীর মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করা। ৪. সম্পদের বরকত ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি। নবীজী স. বলেন, ما نقصت صدقة من مال - "যাকাতের সম্পদ কমে না"। [মুসলিম:৬৭৫৭, তিরমিযী:২০২৯] - অর্থাৎ, হয়ত দৃশ্যতঃ সম্পদের পরিমাণ কমবে, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এই স্বল্প সম্পদের মাঝেই বেশি সম্পদের কার্যকারী ক্ষমতা দিয়ে দিবেন। ৫. সম্পদের উপকারিতার পরিধি বৃদ্ধি করা। কেননা সম্পদ যখন যাকাতের মাধ্যমে অভাবীদের মাঝে বণ্টিত হয়, তখন এর উপকারিতার পরিধি বিস্তৃত হয়। আর যখন তা ধনীর পকেটে কুক্ষিগত থাকে, তখন এর উপকারিতার পরিধিও সঙ্কীর্ণ হয়। ৬. যাকাত প্রদানকারীর দান ও দয়ার গুণে গুণান্বিত হওয়া; অন্তরে অভাবীর প্রতি মায়া-মমতা সৃষ্টি হওয়া। ৭. কৃপণতার ন্যায় অসৎ গুণ থেকে নিজেকে পবিত্র করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, خذ من أموالهم صدقة تطهرهم وتزكيهم بها - "তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করো; যেন তুমি সেগুলোকে এর মাধ্যমে পবিত্র ও বরকতময় করতে পার"। [৯:১০৩] ৮. সর্বোপরি আল্লাহর বিধান পালন করার মাধ্যমে ইহকাল ও পরকালে তাঁর নৈকট্য লাভ করা। যাকাত কখন ফরয হয়: ৭.৫ ভরি স্বর্ণ, ৫২.৫ ভরি রূপা বা সমমূল্যের নিত্য প্রয়োজনোতিরিক্ত সম্পদের মালিক হলে, এবং এ অবস্থায় এক বছর অতিক্রান্ত হলে। এ হিসাবটাকে ইসলামী পরিভাষায় ‘নেসাব' বলে। অতএব, কারো যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর পর্যন্ত থাকে, তাহলে তার উপর যাকাত ফরয হবে। আজ (১১ই জুন, ২০০৯) -এর হিসাব অনুযায়ী: ১ ভরি রূপা= ৫০০ টাকা .:. ৫২.৫ ভরি রূপা= ২৬,২৫০ টাকা অতএব কেউ ২৬,২৫০ টাকার মালিক হলে এবং এ অবস্থায় এক বছর অতিক্রান্ত হলে, তার উপর যাকাত ফরয হবে। (২৬,২৫০ টাকায় শতকরা ২.৫ টাকা হিসেবে মাত্র ৬৫৬.২৫ টাকা যাকাত আসে। অতএব ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। ) কোন কোন সম্পদে যাকাত আসে: ১. নগদ টাকা-পয়সা, ব্যাংক ব্যালেন্স, বন্ড ও অন্যান্য ফাইন্যানশিয়াল ইন্সট্রুমেন্টস ২. সোনা-রূপা; অর্নামেন্ট, বার যা-ই হোক; তা নিত্যব্যবহার্য হলেও। ৩. ব্যবসার সম্পদ; যা ব্যবসার উদ্দেশে ক্রয়কৃত; কিংবা ব্যবহারের উদ্দেশে ক্রয়ের পর বিক্রয়কৃত। ব্যবসার কাঁচামাল, উৎপাদিত বস্তু, বা, উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা বস্তু। শেয়ারও এ পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত। ৪. অন্যান্য প্রয়োজনোতিরিক্ত সম্পদ। টিভিও এ কাতারে অন্তর্ভুক্ত। কাকে যাকাত দেয়া যাবে: ১. মিসকীন: যার কোনো সম্পদ নেই, মানুষের কাছে হাত পেতে চলে। ২. অভাবী: যার সম্পদ আছে, তবে নেসাব পরিমাণ নেই, কারো কাছে হাতও পাতে না সে, অথচ সে তার প্রয়োজন পূরণে অক্ষম। এ কাতারে ঋণ আদায়ে অক্ষম ও ভিনদেশী অভাবী মুসাফিরও পড়বে। চিকিৎসা গ্রহণে অক্ষম ব্যক্তিও এ কাতারে শামিল। অর্থাৎ, কেউ যদি এমনিতে সচ্ছল হয়, কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে অক্ষম হয়, তাহলে তাকেও যাকাতের অর্থ দিয়ে সাহায্য করা যেতে পারে। তবে শর্ত হলো, চিকিৎসার পর্যায়টা এমন হতে হবে যে, যা না করালেই নয়, এবং যে চিকিৎসা করালে তার সুস্থতাও অনেকটা নিশ্চিত। উদাহরণস্বরূপ, যে চিকিৎসা বাংলাদেশে সম্ভব, তা যদি সিরফ বিলাসিতা বশত বিদেশে গিয়ে করাতে চায়, তাহলে সে ক্ষেত্রে তাকে যাকাত দেয়া যাবে না। কিন্তু চিকিৎসকরা যদি বলেন যে, তাকে অমুক দেশে নিতেই হবে, এ ছাড়া কোনো গতি নেই, তখন তাকে সাহায্য করা যেতে পারে। মোটকথা, চিকিৎসা যদি কারো সত্যিই প্রয়োজন হয়, এবং এ প্রয়োজন মেটাতে যদি সে সত্যিই অক্ষম হয়, তাহলে সেও এই অভাবীর পর্যায়ভুক্ত হয়ে যাকাত গ্রহণ করতে পারবে। তবে দুই সম্পর্কের মানুষকে যাকাত দেয়া যাবে না। ১. ঔরসজাত সম্পর্ক। যেমন- পিতা ছেলেকে, বা ছেলে পিতাকে। ২. বৈবাহিক সম্পর্ক। যেমন- স্বামী স্ত্রীকে, বা স্ত্রী স্বামী। এ দুই গ্রুপ ছাড়া অন্য সকল অভাবীকে (উপরোক্ত সংজ্ঞানুসারে) দেয়া যাবে। যাকাত বিষয়ক কিছু জরুরী জ্ঞাতব্য: ১. যাকাতের ক্ষেত্রে নিয়ত করা (যাকাত দিচ্ছি -এই জ্ঞান করা) আবশ্যক। সেটা প্রদান করার সময়ও হতে পারে বা যাকাতের সম্পদ হিসাব করে পৃথক করার সময়ও হতে পারে। ২. প্রতিটা সম্পদের উপর এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া জরুরী নয়। বরং, বছরের মাঝে যে সম্পদ অর্জিত হবে, তাতেও যাকাত আসবে। ৩. যাকাত আদায়ের তারিখে যে যে সম্পদ থাকবে, সে সে সম্পদের যাকাত আদায় করবে। ৪. যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণে মনগড়া/অনুমাননির্ভর হিসাব করবে না। বরং পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে যাকাত আদায় করবে। যেন কোনো ক্রমেই পরিমাণের চেয়ে কম আদায় না হয়। ৫. যাকাত যেদিন হিসাব করে পৃথক করবে, সেদিনের মূল্য ধর্তব্য হবে। ৬. চন্দ্র মাস হিসাব করে যাকাত দিবে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতি বছর রমজানের বা মুহাররমের এক তারিখ যাকাত আদায় করবে।

হজ্ব

কাবার পথে যাত্রা
মুসলমানদের সবচেয়ে বড়ো বার্ষিক সমাবেশ বা মিলনমেলা হলো হজ্জ্ব। হজ্জ্বের আধ্যাত্মিক দিক তো রয়েছেই,তার বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও প্রান্ত থেকে আসা বিচিত্র বর্ণ আর সংস্কৃতির মানুষের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পরস্পরের সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও আন্তরিক যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্যে সুবর্ণ এক সুযোগ সৃষ্টি করে এই হজ্জ্ব। হজ্জ্বের অর্জন অসীম। এর পবিত্র ঝর্ণাধারা সদা বহমান। সেজন্যেই ইসলামের ইবাদাতগুলোর অন্যতম একটি স্তম্ভ হলো হজ্জ্ব। হজ্জ্ব তাই হাজ্বীদের অন্তরে অপূর্ব এক স্মৃতির রেখা টেনে যায়,যেই স্মৃতি তাদের অন্তরে স্থায়ী এক পরিবর্তন এনে দেয়।
সম্প্রতি এক ইউরোপীয় মহিলা মক্কা ভ্রমণ করে একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম দিয়েছেন 'মক্কা ভ্রমণ' মহিলার নাম হলো স্ফোর হাজার। স্ফোর হাজার একজন নও মুসলিম। জার্মানীর নাগরিক তিনি। ইউরোপীয় নও মুসলিম এই ভদ্র মহিলার মক্কা ভ্রমণ কাহিনীটি জনাব মোহাম্মাদ আখগারি ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় কাবাঘর যিয়ারতের ওপর অসংখ্য বই,প্রতিবেদন,প্রবন্ধ-নিবন্ধ আর ভ্রমণ কাহিনী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লেখা হয়েছে। তারপরও প্রফেসর অন ম্যরি শিমাল এ বইটির ভূমিকায় লিখেছেন, এই ভ্রমণকাহিনীর সাথে ইতোপূর্বে লেখা অপরাপর ভ্রমণ কাহিনীর পার্থক্য রয়েছে। কারণটা হলো তরুণ এই লেখক নতুন মুসলমান হয়েছেন। সেজন্যে তিনি গভীর আকর্ষণ এবং অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে মক্কা ভ্রমণের সবকিছু লক্ষ্য করার চেষ্টা করেছেন। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর অন্তরে হজ্জ্বের এতোবেশী প্রভাব পড়েছে যে, তাঁকে আর তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস এবং ঈমান থেকে দূরে সরানো সম্ভব নয়।
স্ফোর হাজার ভ্রমণের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, আমার মাথায়-মুখে ঘাম। ক্লান্ত,তবু প্রশান্ত মনে মর্মর পাথরের একটি থামের সাথে হেলান দিয়েছিলাম। মৃদু বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল। আমার চারদিকে যিয়ারতকারীদের ভিড়। আমি জার্মানীর বিভিন্ন শহর এবং হল্যান্ডের মোট ৪০ জন মুসলমানের সাথে ঝুঁকিপূর্ণ এই সফরটি শুরু করেছিলাম। ফ্রেইবুর্গ এবং শোয়ার্যওয়ার্ল্ড থেকে আমার ভাই-বোনেরাও আমার সাথে এই সফরে সঙ্গী হয়েছেন। কেবল প্রাচ্যেই নয় বরং সমগ্র বিশ্বের মধ্যেই মক্কা ভূখণ্ডের একটা বিশেষ মর্যাদা ও খুবই উচ্চ আসন রয়েছে। প্রতি বছরই কয়েক মিলিয়ন মানুষ কাবা তথা খোদার ঘরের উদ্দেশ্যে মক্কার পথে পা বাড়ায়। যিয়ারতকারীগণ যখন মক্কায় প্রবেশ করে,তখন ৭ বার কাবা ঘরটিকে প্রদক্ষিণ করে। হাজার হাজার মানুষ খালি পায়ে হেরেম শরীফের সাদা মর্মর পাথরের ওপর দিয়ে অগণিত মুসলিম নারী-পুরুষের মাঝে খোদার ঘর তাওয়াফ করে। মনে হয় যেন আল্লাহর রহমতের অসীম সমুদ্রে এসে নিমজ্জিত হচ্ছে তারা,মিশে যাচ্ছে বিচিত্র বিন্দু অভিন্ন সমুদ্রজলে। বিন্দুগুলোর মাঝে ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে,অথচ সেই পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের এক এবং অভিন্ন ভাবছে,তাদের মাঝে যেন কোনো ভেদাভেদ নেই।
প্রতিটি মুসলমানের জন্যে বিশেষ করে আমাদের মতো নওমুসলিমের মনের সবচে বড়ো আকুতি হলো অন্তত একটিবার হলেও কাবা ঘরের যিয়ারত অর্থাৎ হজ্জের সফরে যাওয়া। হজ্জের অর্থ হলো ইসলামে পুনর্জন্ম লাভ করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হজ্জের মাধ্যমে মানুষের ভেতরে পরিবর্তন আনার একটি সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছেন।....এই সেই কাবাঘর। ঘনক্ষেত্র আকারের সাধারণ একটি ঘর। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের লক্ষ লক্ষ মুসলমান এই ঘরটির দিকে মুখ করেই প্রতিদিন নামায আদায় করে। আমি এখন সেই সুমহান ঘরটির মাত্র কয়েক কদম দূরে অবস্থান করছি। আল্লাহু আকবার...।এই ঘরটিকে ঘিরে কেমন রহস্যময় নীরবতা বিরাজ করছে। মনে মনে ভাবলাম! আমি জার্মানীর অমুসলিম পরিবারের একটা মেয়ে বাবা-মা এবং আমার দাদার সাথে এখানে এসেছি। অমুসলিম এবং একজন মহিলা হয়ে কীভাবে তা সম্ভব হলো! সত্যি বলতে কী ! আমার বাবা-মা ও এই স্থানটি সম্পর্কে জানতো না। তাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণে গেছেন কিন্তু এই কাবাঘর দেখার জন্যে সফর করেন নি। ইব্রাহীম ( আ ),মূসা ( আ ), ঈসা ( আ ) এবং মুহাম্মাদ ( সা ) এর খোদা কি আমাকে এই ঘর দেখার সৌভাগ্য দিয়েছেন ?
এখানে সবাই নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করে। আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই এজন্যে যে হজ্জ্ব ভ্রমণের দোয়া তিনি কবুল করেছেন। কেননা এটা আমাদের জন্যে ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। স্ফোর হাজার আরো বলেন,হেরেম শরীফ অর্থাৎ কাবাঘরের চারপাশের পবিত্র অঙ্গনে আমি বসে বসে গভীরভাবে দেখছিলাম,কাবাকে ঘিরে মানুষের ঢল,চলমান। কালো-সাদা-কফি রঙের,বৃদ্ধ,যুবক,নারী-পুরুষ-শিশু সবাই পোশাক বলতে সাদা এক টুকরো কাপড় কোমর আর ঘাড়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে। কেউ চুপ চাপ। কেউবা আবার হা করে কাবা ঘরের দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ কোরআন তেলাওয়াতে মশগুল,আবার অনেকেই কথাবার্তায় ব্যস্ত। এই জন সমাবেশের মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যটি হলো এখানকার সবাই পরিতৃপ্ত এবং প্রশান্ত। কত বড়ো সৌভাগ্যের কথা যে,এই গ্রহের মানুষ এমন কারো মাঝে বাস করছে যারা ভালো এবং কল্যাণকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং তারা সৎ বন্ধুও বটে। আমি নিজেকে সকল যিয়ারতকারীর মাঝেও নিঃসঙ্গ বা একা ভাবছি না বরং নিজেকে এমন একজনের মতো ভাবছি যার সৃষ্টিকর্তা তাকে দেখছে এবং ইে সৃষ্টিকর্তা তার বান্দার অবস্থা সম্পর্কে সদাসচেতন।
নিজেকে অচেনা অজানা বলে মনে হচ্ছে। আচ্ছা এটা কি স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির প্রেম নাকি সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার? এটা বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহর শক্তিমত্তার প্রকাশ যে, তিনি নভোমণ্ডলের প্রতিটি গ্রহ-নক্ষত্রকে নিজ নিজ কক্ষপথে পরিচালিত করছেন। এখানে যে বিষয়টি উপলব্ধি করা যায় তাহলো আল্লাহ পাক সর্বত্র এবং সবকিছুর ওপরই ক্ষমতাশীল। তাঁর রহমতের ছায়া সর্বত্র বিস্তারিত। তিনি অসীম দয়ালু। আমরা মানুষেরা তাঁর নেয়ামতের সীমাহীন সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি। বলা যায় আমরা তাঁর মাঝে,তাঁর অসীম সত্য ও বাস্তবতার মাঝে বিলীন হয়ে গেছি। এখন তাঁর অভাবে আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না। ছোট্ট একটি বিন্দু যেমন মহাসমুদ্রে বিলীন হয়ে চিৎকার করে বলে ওঠে-আমি আর বিন্দু নেই,আমি এখন সমুদ্র।
স্ফোর হাজার তাঁর এই ভ্রমণ কাহিনীটির অন্যত্র লিখেছেন,এরকম একটা উদ্দীপনাময় আবেগ নিয়ে মাসজিদুল হারামের পিলারের ছায়ায় ছায়ায় আমি কাবার কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছি। হঠাৎ পরিবর্তিত এক দৃষ্টিকোণ থেকে কাবার একটি অংশকে দেখলাম। মনে হলো যেন সে ও আমাদেরকে দেখছে। আমি প্রতিরোধের শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। এক ধরনের আনন্দ যেন আমার অস্তিত্বকে ঘিরে,আমি যেন আত্মিক দিক থেকে উচ্চ এক অবস্থায় রয়েছি। আমি পায়ের জুতোগুলো খুলে ফেললাম। মাসজিদুল হারামের বি¯তৃত শ্বেত অঙ্গনে ধীরে ধীরে প্রশান্তভাবে আমার পা ফেললাম এবং যিয়ারতকারীদের তাওয়াফের বন্যায় একটি ছোট্ট বিন্দুর মতো নিজেকেও মিলিয়ে নিয়ে প্রথমবার তাওয়াফ করলাম। আল্লাহু আকবার অলিল্লাহিল হামদ...মুসলমানরা কেন হজ্জ্ব করতে যায়-এ প্রশ্নের উত্তর আমি এখন দিতে পারবো।
এর উত্তর হলো মক্কা হচ্ছে তৌহিদের দোলনা আর এই শহর ঈমান এবং আল্লাহর একত্ববাদের উৎসভূমি। এই শহরের ইতিহাস মানব সভ্যতার ইতিহাসের সাথে সমান্তরাল। ঐশী ভাষ্য অনুযায়ী এটাই হলো সেই স্থান যে স্থানে সর্বপ্রথম আল্লাহর ইবাদাত করা হয়েছিল। এ কারণেই মক্কা-মদীনা ভ্রমণ করা মানে হলো ইসলামের অন্তরে ভ্রমণ করা। আর ইসলামের অন্তর ভ্রমণ করার মানে হলো মানবতার হৃদয়ে ভ্রমণ করা। হাদীসে কুদসিতে যেমনটি এসেছে-আকাশ কিংবা ভূমিতে আমার জায়গার সংকুলান নেই,কিন্তু মুমিন ব্যক্তির অন্তরে আমার স্থান রয়েছে।
এখন আমি আল্লাহর শোকর আদায় করছি এজন্যে যে,তিনি আমার দৃষ্টি খুলে দিয়েছেন এবং এই বরকতপূর্ণ উপত্যকা দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। একটি রেডিওর সাংবাদিক আমার স্বামী সেলিমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন-ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছো কেন? সেলিম চমৎকার একটি জবাব দিয়েছে। সে বলেছে-আমি তো ইসলামে প্রবেশ করি নি,ইসলাম আমাদের মাঝে প্রবেশ করেছে। আলহামদু লিল্লাহ! আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইসলামের মাধ্যমে আমাদেরকে তাঁর নিজের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পিত করেছেন। মিসেস হাজারের মতে-ইসলাম হলো আল্লাহর অসীম রহমতে মানুষের ব্যাকুল মনের ইচ্ছা পূরণ হওয়া। আর এটা এমন এক জিনিস যা আমি খ্রিষ্টধর্মে দেখি নি,এমনকি স্বপ্নেও না।
দ্বিতীয় পর্ব
হজ্জ্বের আধ্যাত্মিক সফর ইসলামের ইবাদাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জাঁকজমকপূর্ণ। প্রতিটি হজ্জ্বযাত্রীই অল্প সময়ের জন্যে হলেও মনের গভীরে তার একটা বিশেষ প্রভাব অনুভব করে। গত আসরে আমরা জার্মানীর এক নওমুসলিম মহিলার লেখা কাবা ভ্রমণের কাহিনীতে দেখেছি যে,ইসলাম কীভাবে একজন মানুষকে আধ্যাত্মিক ও লক্ষ্যমুখী জীবন দান করে। তিনি একটা বিশেষ আকর্ষণ ও অনুভূতি নিয়ে কাবা সফরে গেছেন,যাতে তিনি হজ্জ্বের করণীয় আনুষ্ঠানিকতাগুলোর মধ্য দিয়ে আল্লাহর পথকে অনুসরণ বা অতিক্রম করতে পারেন এবং আধ্যাত্মিক জীবনের আস্বাদন লাভ করতে পারেন।
কাবাঘরে উপস্থিত হবার পর নিজেকে সৌভাগ্যবতী বলে মনে করলেন এবং আল্লাহর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা পোষণ করলেন। তিনি তাঁর অনুভূতিগুলো প্রকাশ করেছেন এভাবে-'আমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমি এখানে উপস্থিত হয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস না হলেও এটাই প্রকৃত বাস্তবতা যে,আমি পবিত্রতম স্থানে আমার পা রেখেছি।' মানুষের অন্তরাত্মার বিশুদ্ধতার জন্যে হজ্জ্বের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। মিসেস হাজার হজ্জ্বকে একটি উপঢৌকন হিসেবে অন্যদেরকে উপহার দিচ্ছেন। তিনি বলেন- 'তুমি তোমার জীবনে কী করবে? কীভাবে জীবনটা কাটাবে? অন্তত একবারের জন্যে হলেও কাবা দর্শনে যাবার চেষ্টা করবে।সেখানে গেলে এমন একটি ঘর দেখতে পাবে যার সম্পর্কে সৃষ্টিকর্তা বলেছেন, মানুষের জন্যে সর্বপ্রথম যে ঘরটি তৈরী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা হলো মক্কার এই কাবাঘর যা অশেষ কল্যাণময় এবং সমগ্র মানব জাতির জন্যে পথপ্রদর্শক। সেখানে আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত সৌভাগ্যবান বহু মনীষীর মাযারও রয়েছে সেসব মাযার যিয়ারত করতে যাও। কাবা এমন একটি স্থান যার প্রতি ইঞ্চি জায়গা আল্লাহর রহমতে পরিপূর্ণ। এটা সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার যা হজ্জ্ব থেকে তোমার জন্যে আনা সম্ভব। তাই সিদ্ধান্ত নাও,হজ্জ্বে যাবার জন্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করো। আর যখনই এই সফরে যাও,আমাদের পক্ষ থেকে,জার্মানীর মুসলমানদের পক্ষ থেকে মুহাম্মাদ ( সা ) এবং তাঁর আহলে বাইতের ওপর দরুদ ও সালাম পাঠিয়ে দিও।'
হজ্জ্ব মুসলিম এই নারীর জন্যে সৌন্দর্য,পরিবর্তন এবং আধ্যাত্মিকতার শুভবার্তা নিয়ে এসেছে। তাঁর জীবনকে এই বার্তা নতুন এক রং-রূপ ও অর্থ দিয়েছে,যে অর্থ তাঁকে তাঁর অতীত জীবন থেকে আলাদা করে দিয়েছে। তিনি লিখেছেন-কাবা থেকে সামান্য দূরে চতুর্কৌণিক এই ঘরটিকে ঘিরে বৃত্তের মতো ঘুরছিলাম। অনুভব করলাম এখানে হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর রয়েছে যার সামনে দাঁড়ানো যেতে পারে। চেষ্টা করছি কাবার একেবারে কাছে যেতে...আধা মিটারের মতো আর বাকি...কিন্তু হঠাৎ করে মানুষের ঢলে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। আমার জন্যে এটা এক মজার অভিজ্ঞতা যে এখানকার সবকিছুই চলমান। কিন্তু রেশমি কাপড়ের ওপর স্বর্ণালী কাজ করা গিলাফে ঢাকা কাবা শরীফ মর্যাদার সাথে দাঁড়িয়ে আছে। সে যেন তাওয়াফকারী হাজ্বীদেরকে আন্তরিক এবং প্রকৃত প্রশান্তি উপহার দিচ্ছে। নিচের দিকে তাকালে কাবার দেয়ালের পাথরগুলো দেখা যায়। এই ঘরের মালিকের সাথে নৈকট্য অনুভব করছি, ঘুরছি এবং গুণ গুণ করে পড়ছি-লাব্বাইক..আল্লাহুম্মা লাব্বাইক.....
একটা অবর্ণনীয় ব্যাপার। লক্ষ লক্ষ মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে এখানে সমবেত হয়েছে,কী চাচ্ছে তারা,কাকেই বা চাচ্ছে! আমি চোখ বুজি। অন্যদের সাথে নিজেকে মেলাতে পেরে এক ধরনের আনন্দ বোধ করলাম। তারপর সাফা-মারওয়ায় গিয়ে ইব্রাহীম ( আ ) এর স্ত্রী হাজেরা ( সা ) এর কাজটির পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি পানির সন্ধানে ৭ বার সাফা এবং মারওয়ার মাঝখানে দৌড়ে ছিলেন। তাঁর স্মরণে আমিও তাই করলাম। ভাবলাম,মক্কা শহরটি তো যমযম পানির কুপ আবি®কৃত হবার কারণেই গড়ে উঠেছে,আর একজন নারী সেই কূপটির আবিষ্কর্তা। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর নামের সাথে আমার নামের মিল রয়েছে। হাজেরা ছিলেন ইব্রাহীম ( আ ) এর স্ত্রী এবং ইসমাঈল ( আ ) এর মা। তিনি ছিলেন একজন খোদাপ্রেমী। আল্লাহর ওপর তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা। মনের ভেতর এ রকম একটা অনুভূতি লালন করে চমৎকার একটি দিন কাটালাম।
মিসেস স্ফোর তাঁর ভ্রমণকাহিনীর অন্যত্র নবীজীর শহর মদীনার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন,মসজিদে নববীর বারান্দার নিচে মর্মর পাথরের ওপর হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াই। এই মসজিদের সম্মান এবং মর্যাদাই মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। আমিও ভাবলাম-আমি এমন নেতার যিয়ারতে এসেছি যিনি সূর্যের মতো আলো বিলিয়েছেন মানুষের মাঝে,ফলে আমার উচিত ওযু করে নেওয়া। হঠাৎ কানে ভেসে এলো এক মিষ্টি মধুর ধ্বনি,আযানের ধ্বনি। মুয়াযযিন অপেক্ষমান মুসল্লিদের সুরেলা কণ্ঠে আহ্বান জানায়। তাঁর ঐ আযানের ধ্বনি শূণ্যে ঘুরপাক খেয়ে বেড়ায়। এ ধরনের সুরেলা আযানের ধ্বনি কেবল মদীনাতেই শুনতে পাওয়া যায়। আযান শোনার পর মুসল্লিরা দলে দলে এসে নামায আদায়ের জন্যে সমবেত হয়। সেদিন থেকে যেখানেই যখন আযানের ধ্বনি শুনতে পাই, তখনই নবীজীর পূণ্যভূমি মদীনার স্মৃতি আমার মনে ভেসে ওঠে আর অজান্তেই আমার দু'চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্র",সেটা আনন্দের নাকি আবেগের-কে জানে।
জার্মান এই মুসলিম মহিলা আরো বলেন,আমি কিছুই জানতাম না মদীনার কোথায় যাবো,ঠিক কোন জায়গাটাকে ইবাদাতের জন্যে বেছে নেবো। যাই হোক ওজু করার পর ভালো লাগছিল,পুরো পৃথিবীটাকে অন্যরকম মনে হচ্ছিল। এই প্রথমবারের মতো আমি মদীনায় নামায পড়ছি। এই নামায কতো প্রশান্তিদায়ক। কেবলি মনে হচ্ছিল যেন রাসুলে খোদা আমাকে দেখছেন। মদীনার দিনগুলো আমার এতো বেশি স্মৃতিময় যে কখনোই তা ভোলা যাবে না। আমাদের কাফেলার আলেম বলেছেন-অধিকাংশ যিয়ারতকারীই জানে না যে মদীনায় প্রতি মুহূর্তে ৭০ হাজার ফেরেশতা যাওয়া-আসা করে। কেননা এখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন এমন এক মহান ব্যক্তিত্ব যাঁর গঠনমূলক ও উন্নত শিক্ষা পেয়ে বিশ্ব আমূল পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। সকল নবীই মানুষকে খোদার সাথে পরিচয় করানো এবং তাদের ভেতর খোদার প্রেম জাগানো অর্থাৎ আল্লাহর পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সত্যি বলতে কী,যে-কেউ এক বারের জন্যে হলেও মদীনায় আসে এবং নবীজীর রওযার সামনে দাঁড়ায়,তার মাঝে সেই প্রেমবোধ অনুভূত হয়।
মিসেস স্ফোর তাঁর মক্কা ভ্রমণ কাহিনীতে মাঝে মধ্যেই কিছু প্রশ্নের অবতারণা করেছেন এবং শীঘ্রই সেসব প্রশ্নের উত্তরও পেয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন এটা কি আদৌ সম্ভব যে জার্মান নাগরিক হয়ে মুসলমান হওয়া যাবে? আচ্ছা ইসলাম কি কেবল প্রাচ্যের জনগণেরই উপযুক্ত ধর্ম? ইসলাম ধর্মের যে সম্মান এবং এই ধর্মের নবীর যে উচ্চ মর্যাদা-তা প্রমাণ করে যে ইসলাম কেবল প্রাচ্যের জনগণের জন্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সুমহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী নবীজীর সার্বজনীন চিন্তা এবং নির্দোষ-নির্মল আচরণ ও কর্মতৎপরতা থেকে অন্তত তাই মনে হয়। মুহাম্মাদ ( সা ) আজ পর্যন্ত মানুষের জন্যে নৈতিক ও চারিত্র্যিক সৌন্দর্যের অনুসরণীয় শ্রেষ্ঠ আদর্শ। তাঁর সুন্নাত বা কর্মকাণ্ডের যে ঐতিহ্য তা কেবল একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মানুষের জন্যে সীমাবদ্ধ থাকার মতো নয় বরং তা বিশ্বজনীন। কেননা তিনি নতুন অর্থাৎ আজগুবি কোনো কিছু নিয়ে আসেন নি বরং তাঁর শিক্ষাগুলোর মধ্যে এমন কিছু চিন্তা বা বিবেকের খোরাক রয়েছে যেগুলো এর আগেও মানুষের স্বভাব-প্রকৃতিতে বিরাজমান ছিল। তিনি কেবল যথার্থ নেতৃত্ব দিয়ে চোখের ভেতর সত্যের নূর প্রজ্জ্বলিত করে দিয়েছেন এবং সবাইকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করেছেন।
জার্মান নওমুসলিম মহিলা মিসেস স্ফোর তাঁর মক্কা ভ্রমণকাহিনীর উপসংহারে রাসূলে খোদার সাথে তার অঙ্গিকার নবায়ন করে লিখেছেন, শেষবারের জন্যে মসজিদে নববীর দিকে যাচ্ছি তাঁকে সালাম জানাতে এবং প্রিয়নবীর কাছ থেকে বিদায় নিতে। যে দরুদ পাঠের মধ্য দিয়ে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেই,সেই সুর এখনো আমার অন্তরে একইভাবে বাজে। আমি জানি রাসূলে খোদার রওজা মোবারক যিয়ারত করতে পারাটা পরম এক সৌভাগ্য। এই রওজার মুহাম্মাদী নূর সকল মানষকে আলোকিত করে। যাই হোক,আমরা দোয়া করার জন্যে হাত তুললামঃ হে প্রিয় রাসূল! আল্লাহর প্রিয়তম বন্ধু এবং দূত! তুমি সবসময় সর্বত্র আমাদের সাথে থেকো। আমাদের নিঃসঙ্গ করে ছেড়ে যেও না। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর দরবারে আমাদের জন্যে দোয়া করো যাতে অন্তত আরেকটিবার তোমার যিয়ারতে আসতে পারি। হে দোয়াকারীদের সহায়ক! হে মুমিনদের নেতা!

রোযা

ঐশী আতিথ্যের মাস-রমজান
ফামান শাহিদা মিনকুমুশ্‌ শাহরা ফাল্‌ইয়াসুমহু
" কাজেই তোমাদের মাঝে যে মাসটি পাবে, সে যেন রোযা রাখে।"
সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াত এটি। এই একটি মাত্র আয়াত থেকেই প্রমাণিত হয় যে, সাওম বা রোযা সবার জন্যেই অবশ্য পালনীয় একটি ইসলামী বিধান। ইসলামের মৌলিক পাঁচটি বিধানের একটি হলো রোযা। তবে এই বিধানটি কেবল আমাদের জন্যেই নয় বরং আমাদের পূর্ববর্তী নবী রাসূলগণের উম্মাতদের জন্যেও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে বিধিবদ্ধ করা হয়েছিল। যেমনটি কোরআনেই বলা হয়েছে, ‘কামা কুতিবা আলাল লাজিনা মিন ক্বাবলিকুম' অর্থাৎ 'যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও সিয়ামকে ফরয করা হয়েছিল।'
অশোধিত তেলকে যেমন পরিশোধন করেই জ্বালাতে হয়, ব্যবহার করতে হয়, তেমনি মানুষের মন ও আত্মাকেও যথার্থভাবে কাজে লাগানো বা ব্যবহার করার জন্যে বছরে একবার তাকে পরিশোধন করে নিতে হয়। নইলে অশোধিত তেলের মতো ময়লাযুক্ত আত্মা কিংবা মনে খোদায়ী নূর জ্বলবে না। পবিত্র রমযান মাস হলো অন্তরাত্মাকে পরিশোধন করার শ্রেষ্ঠ সময়। ব্যক্তিগত বিচিত্র ভুলের কারণে শয়তানীর যতো আচ্ছাদন পড়েছে মানুষের অন্তরের আয়নায়, যতো মরিচা ধরেছে তাতে অন্যায় আচরণ আর অনৈতিকতার চর্চার কারণে, সেগুলোকে ধুয়ে মুছে পূত-পবিত্র করে মনের ঘরে আধ্যাত্মিকতার প্রদীপ জ্বালানোর সর্বোত্তম সময় রমযান। পবিত্র কোরআনের সূরা যুমারে আল্লাহ বলে দিয়েছেন, ‘ইন্নামা ইউয়াফফাস সাবিরুনা আজরাহুম বিগাইরি হিসাব' অর্থাৎ যারা প্রবৃত্তির রিপুগুলোকে দমন করে সঠিক পথে অটল থাকবে, তাদেরকে অগণিত সওয়াব প্রদান করা হবে। আর রমযান মাসটিই হলো তার অনুশীলনের শ্রেষ্ঠ ও যথার্থ সময়।
এই মাসটি যেন রোযাদারের জন্যে মেহমানীর মাস। রোযাদার হলেন আল্লাহর মেহমান আর মেহমানের সামনে যে দস্তরখান আল্লাহ বিছিয়ে দিয়েছেন তাতে রয়েছে রহমত, তাতে রয়েছে বরকত এবং তাতে রয়েছে মাগফেরাতের বিচিত্র ভোজের রেসিপি। এখন যারা এইসব ঐশী ভোজে নিজেকে তৃপ্ত-পরিতৃপ্ত করতে চান তারা কোনোরকম কার্পণ্য না করে, কোনোরকম অবহেলা কিংবা কালক্ষেপন না করে নিজেকে সমৃদ্ধ করবেন-এটাই স্বাভাবিক। ইবাদাত আর আধ্যাত্মিকতার সুগন্ধি দিয়ে নিজেদের অন্তরাত্মাকে মৌ মৌ করে তুলবেন-সেই সুবর্ণ সময় এসেছে আজ। মৌলাভি যেমনটি বলেছেন,
সত্যের সুগন্ধি শীতল সমীর
এ সময় নিয়ে আসে ঐশী পাঠ
অপূর্ব এ উপহার থেকে সন্তর্পনে
যতো পারো করে যাও লুটপাট।
রহমতের সমীরণ এসে আবার চলে যায়
যাকে ইচ্ছে তাকে সে প্রাণবায়ু দিয়ে যায়
আবার এসেছে আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
প্রস্তুতি নাও হে গোলাম, করো অবগাহন।
হিজরী পঞ্জিকার বারোটি মাসের মধ্যে একটি মাসের নাম হলো রমযান। অথচ মজার ব্যাপার হলো পবিত্র কোরআনে কেবলমাত্র এই রমযান মাসেরই নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেই বিশ্লেষকমহল মনে করছেন যে, আল্লাহর কাছে এ মাসটির অসামান্য মর্যাদা রয়েছে। যেমনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই বলেছেন, ‘আস সাওমু লি, অ-আনা আজযি বিহী' অর্থাৎ ‘রোযা আমার জন্যে রাখা হয এবং আমিই তার প্রতিদান দেবো।' পরকালে যে তিনি কী পুরস্কার দেবেন তার কিছুটা ইঙ্গিত নবী কারিম (সাঃ) আমাদের দিয়েছেন। সে থেকে রোযাদারগণ নিশ্চয়ই পরিতৃপ্ত হবার আনন্দ পাবেন। রাসূলে খোদা বলেছেন, ‘রমযান এমন একটি মাস যে মাসে আল্লাহ তোমাদের জন্যে রোযা রাখাকে ফরজ করে দিয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রোযা রাখবে, তার জন্যে রোযার সেই দিনটি হবে এমন যেন সবেমাত্র সে মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে, অর্থাৎ রোযাদার তার সকল গুণাহ থেকে মুক্তি পেয়ে নিষ্পাপ শিশুটির মতো হয়ে যাবে।
আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের প্রতি এ যে কতো বড়ো রহমত, কতো বড় বিশাল এক অনুগ্রহ তা বোঝানো সম্ভব নয়। কেবল অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করার বিষয় এটি। নবী কারিম (সাঃ) বলেছেন, যখনই রমযানের শুভাগমন ঘটে, তখনি আল্লাহর রহমতের দরোজাগুলো খুলে যায় আর জাহান্নামের দরোজাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সেইসাথে শয়তানকে লোহার জিঞ্জীর বা শেকলে আবদ্ধ করা হয়। এই হাদিস থেকে যে বিষয়টি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে তাহলো, রমযান ব্যতীত এগারোটি মাসেও আমরা আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগী করার চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনার কারণে অনেক সময় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ইবাদাত করা হয়ে ওঠে না। এই মাসে যেহেতু শয়তানকে আটকে রাখা হয়, তাই তার মাধ্যমে প্ররোচিত হবার কোনো আশঙ্কা নেই ফলে যতো খুশি ইবাদাত করার সুযোগ রয়েছে এই মাসে। সুবর্ণ এই সুযোগকে আমরা যেন কোনোভাবেই কাজে লাগাতে ব্যর্থ না হই-সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। কিন্তু কী কর্মসূচি থাকতে পারে এই মাসে, এবার সেই প্রসঙ্গে অলী-আওলিয়াদের সংক্ষিপ্ত দিক-নির্দেশনা তুলে ধরা যাক। আহলে বাইতের মহান ইমামগণ রমযানের দৈনন্দিন করণীয় সম্পর্কে চমৎকার দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। এমনকি কীভাবে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাইতে হবে-তারও নির্দেশন রেখে গেছেন তাঁরা।
বেহেশত হলো আল্লাহর ইবাদাত বা আনুগত্যকারীদের পুরস্কার। রোযাও আল্লাহর দেয়া অবশ্য পালনীয় দায়িত্বগুলোরই একটি। রমযান মাসের এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরো কিছু ইবাদাত অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। যেমন- কোরআন তেলাওয়াত করা, এহসান বা দয়াপরবশ হওয়া, দান-খয়রাত করা, তওবা এস্তেগফার করা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার লাভে যোগ্য সকল গঠনমূলক ইবাদাত এ মাসের অবশ্য করণীয় কিছু দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সন্তুটিষ্ট অর্জন করার এবং নৈতিক চরিত্র গঠন করার সৌভাগ্য দিন। যেমনটি হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, ‘ আল্লাহ আমাদের ওপর রোযা ফরজ করেছেন, নৈতিক চরিত্র গঠনে শিক্ষা দেয়ার জন্যে। সেই শিক্ষা যাতে আমরা পেতে পারি এবং তা কাজে লাগাতে পারি সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

নামায

নামায একটি গঠনমূলক ইবাদাত। আল্লাহর সামনে ঐকান্তিক নিষ্ঠার সাথে কায়মনোবাক্যে নিজের সচেতন উপস্থিতি ঘোষণা করার অন্যতম একটি প্রধান ইবাদাত হলো নামায। মানুষের জীবনদৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক উন্নতির ক্ষেত্রে নামাযের একটি মৌলিক ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই যারা প্রকৃত নামায আদায়কারী,তাদের সাথে অন্যান্যদের আচার-ব্যবহারগত পার্থক্য রয়েছে। এ ধরনের লোকজন মানসিক এবং আত্মিক ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। খুব কমই তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যোগ দেয়। ইসলামে নামায হলো সর্বোৎকৃষ্ট ইবাদাত এবং নামাযই হলো স্রষ্টাকে অনুভব করার জন্যে মানব জাতির পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী পন্থা বা উপায়।

ইবাদাত-বন্দেগি করা কিংবা আল্লাহর প্রশংসা বা গুণগান করা মানবাত্মার প্রাচীনতম একটি বৈশিষ্ট্য বা বহিপ্রকাশ। এটা মানুষের সত্ত্বাগত মৌলিক একটি দিক। মানব জীবনেতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে,যখন এবং যেখানেই মানুষের উপস্থিতি ছিল,সেখানেই প্রশংসা-কীর্তন বা প্রার্থনারও অস্তিত্ব ছিল।তবে ইবাদাতের ধরন বা পদ্ধতি কিংবা খোদা বা প্রার্থনীয় সত্ত্বা গোত্রভেদে বিভিন্ন ছিল। কেউ সূর্য বা তারকাকে খোদা বলে মনে করতো, কেউবা আবার কাঠ-পাথরের তৈরী মূর্তিকে পূজা করতো। কিন্তু মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশেষ করে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্যে নবী-রাসূলদের পাঠানোর পর তাঁরা যখন মানুষকে নিজেদের সম্পর্কে ধারণা দিলেন তাদেরকে সচেতন করে তুললেন,তখন তারা সর্বশক্তিমান এক স্রষ্টার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো এবং এক স্রষ্টার ইবাদাতে আত্মনিয়োগ করলো।

মার্কিন মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস বলেন,মানুষ তার নিজের একান্ত বন্ধুকে কেবল তার আভ্যন্তরীণ চিন্তারাজ্যেই পেতে পারে। অধিকাংশ মানুষ সচেতনভাবেই হোক কিংবা আনমনেই হোক,ঠিক তার অন্তরের গহীন জগতেই তাকে খুজে বেড়ায়। চিন্তারাজ্যের এই গহীন স্তরে গেলে একজন তুচ্ছ ব্যক্তিও নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান বলে উপলব্ধি করে। এই যে মহাকাব্যিক বীর-পালোয়ান সৃষ্টি,বড়ো বড়ো জ্ঞানী-গুণী মনীষী,খোদার পথে কিংবা দেশের জন্যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার যে স্পৃহা-এ সবই মানুষের মধ্যকার পবিত্রতার উপলব্ধি থেকে উৎসারিত। কেননা মানুষ চায় প্রশংসনীয় এমন কিছুর অস্তিত্ব যাকে ভালোবেসে পূজা করা যায়। এ কারণেই ইতিহাসের কাল-পরিক্রমায় দেখা গেছে বহু মানুষ নিষ্প্রাণ অপূর্ণ বহু সৃষ্টির পূজা করেছে। যা ছিল মূল পথ থেকে বিচ্যুত।

অনেকেই প্রশ্ন করে মানুষের মাঝে এই যে ইবাদাত করার উপলব্ধি,তাতে তার কী লাভ? বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে এবাদাতের অনুভূতিটা আসলে অপূর্ণ সৃষ্টির পরিপূর্ণতা অর্জনের জন্যে একটা সহজাত প্রচেষ্টা। মানুষ সবসময়ই চায়, তার সীমিত অস্তিত্ব থেকে অসীমতার দিকে পাড়ি জমাতে। এলক্ষ্যেই মানুষ চায় ইবাদাত-বন্দেগির মাধ্যমে এমন এক বাস্তব সত্যে উপনীত হতে,যেখানে সীমা নেই,নোংরামি নেই অপূর্ণতা নেই,বিলয় নেই। ইকবাল লাহোরী যেমনটি বলেছেন,ইবাদাত জীবনের বিকাশমূলক এমন একটি প্রচলিত প্রবণতা যার মাধ্যমে আমাদের ব্যক্তিত্বের ছোট্ট দ্বীপ নিজেকে সামগ্রিক বিশালতার মাঝে উপলব্ধি করে। আইনস্টাইনও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন,একজন তুচ্ছ ব্যক্তিও ইবাদাতের সময় নিজের বিশালত্ব টের পায়।

অবশ্য স্রষ্টার ইবাদাত করার ব্যাপারটি কেবল মানুষেরই স্বতন্ত্র প্রবণতা নয়। সৃষ্টি জগতের সবকিছুই মূলত আল্লাহর সমীপে আত্মনিবেদিত। বিশ্বের সকল বস্তুই আল্লাহর অনুগ্রহে সঞ্চরণশীল। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের দৃষ্টিতে পৃথিবীর প্রতিটি অনু-পরমাণু সত্যের পূজারী। যেভাবে সকল মানুষ সচেতন ভাবেই হোক বা অসচেনভাবেই হোক,তারা সত্যেরই প্রার্থনা করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা এসরা'র ৪৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন-সপ্ত আকাশ এবং পৃথিবী,এবং যা কিছু তাদের মাঝে রয়েছে সবাই আল্লাহর তাসবিহ ও পবিত্রতার গুণগান গাইছে,এবং সকল বস্তুই আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা ঘোষণায় লিপ্ত। কিন্তু তোমরা তাদের পবিত্রতা তাসবিহ বা প্রশংসা ঘোষণা বোঝ না। বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ফারাবির দৃষ্টিতে আকাশের পরিভ্রমণ,পৃথিবী ঘূর্ণন,বৃষ্টি পড়া এবং পানির প্রবাহ সবকিছুই তাদের আল্লাহর মহিমা ও ইবাদাতেরই লক্ষণ। মাওলানা রুমি এই ধারণাটিকে কাজে লাগিয়ে কটি পংক্তিও লিখেছেন।

পৃথিবীর প্রতিটি অণু-পরমাণূ গোপনে
তোমার সাথে কথা বলে দিবারাত্রী
সচেতন আমরা তার সবই দেখি এবং শুনি
তোমার সাথে অচেনা আমরা তাই চুপচাপ
পার্থিব জগতের মোহে ছুটছো শুধু
খোদায়ী জ্ঞানের অধিকারী হবে কবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এক এবং একক। তিনি স্ময়ং সম্পূর্ণ অস্তিত্বের অধিকারী। তিনি প্রকৃতিগতভাবেই সকল গুণে গুণান্বিত এবং সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটির উর্দ্ধে। বিশ্বের সাথে তার সম্পর্কটা হলো সৃষ্টি, ব্যবস্থাপনা, প্রেরণা বা অনুগ্রহ প্রদান করা ইত্যাদি।

আমরা যখন তাঁকে এইসব গুণাবলির মাধ্যমে চিনতে পারবো, তখন এই চেনাটাই আমাদের মাঝে স্রষ্টা সম্পর্কে বিনয়, প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা সৃষ্টি করবে। এ অবস্থায় যেই স্রষ্টা পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান, আকাশ এবং যমীনের সকল কিছুর ব্যবস্থাপক, তিনি মানবাত্মাকে নিজের সাথে সম্পর্কসূত্রে আবদ্ধ করেন এবং তাদেরকে শক্তি প্রদান করেন যাতে তাদের অন্তর প্রশান্ত হয় একং মানসিক স্থিরতা আসে।
এভাবেই সকল মানুষ এমনকি যারা পৃথিবীকে বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টিতে দেখে, তাদের জীবনেও প্রশংসা এবং প্রার্থনার প্রয়োজন রয়েছে। যারা গতানুগতিক জীবন যাপন করে অর্থাৎ যাদের জীবনে প্রতিটি দিনই আগের দিনের পুনরাবৃত্তির মতো, যাদের জীবন হতাশাগ্রস্ত, তারাও চায় উন্নততরো বাস্তবতা তথা খোদার সাথে অন্তরঙ্গ হতে এবং তার প্রশংসায় লিপ্ত হতে। আসলে মানব বৈশিষ্ট্যটাই এমন যে, সে চায় বিপদ থেকে নিরাপদ থাকতে এবং সুখি ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে।
ইসলাম মানুষের এই প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং ইবাদাতের অনুভূতি লালনের চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে মানুষ চায় সত্যকে আবিষ্কার করতে এবং পূর্ণতায় উপনীত হতে।

নামায হলো ইবাদাত-বন্দেগি আর প্রশংসার সুস্পষ্টতম রূপ। নামায হলো ইসলামী ইবাদাতগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এবং দ্বীনের মূল ভিত্তিগুলোর একটি। নামায আদায়কারী যখন আল্লাহর স্মরণের মাধুর্যকে অনুভব করে এবং কোরআন তেলাওয়াত করে, যিকির করে, তখন সে আল্লাহর সৌন্দর্য আর বিশালত্বের মাঝে বিলীন হয়ে যায়। এরকম অবস্থায় তার অন্তরাত্মা পূত-পবিত্রতা আর পূর্ণতার দিকে ধাবিত হয়।